Feeds:
Posts
Comments

Archive for January 25th, 2019

আমরা কথা বলি গদ্যে, ভাবি গদ্যে, হয়তো স্বপ্নও দেখি গদ্যে, কিন্তু তবু সাহিত্যর আদিরূপ পদ্য। পদ্য মানে ছন্দোবদ্ধ গদ্য, মাঝে মাঝে তা কবিতা হয়ে ওঠে কিন্তু সর্বদা নয়।বাঙালি মানসে পদ্যে অন্তঃমিল জরুরি। ছন্দের কান যাদের নেই তাঁরাই এ থ়িওরির উদ্গাতা। আহা বেচারারা, পেট থেকে পড়েই তো কেউ প্রবোধ সেনের মত ছান্দসিক হয়নযাঁরা ছন্দ বোঝেননা তাঁরা ইতরজন ও মিষ্টান্নের অধিকাকখনো কঅবিতা লেখেননিএমনপদ্যকাকেওস্বভাষায় কবি বলি। গদ্যকারদের তেমন কোনও এক শব্দের উপনাম নেই।কোনও জীবনানন্দ লেখেননি যে “সকলেই গবি নন, কেউ কেউ গবি।গদ্য হোক বা পদ্য, ভাষা সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুব ভালাভাসা। এমন ভাবার কারণ নেই যে ভাষার উদ্ভব হোমো স্যাপিয়েন্স স্যাপিয়েন্সের কন্ঠে।দু ফেরতা স্যাপিয়েন্ট হয়ে ওঠার ঢের আগে থেকেই বৃক্ষবাসী বা গুহাচারী লেজহীন বানরাদির নিশ্চয়ই ভাষার প্রয়োজন ছিল,তাদের বাক-যন্ত্রও প্রায আমাদের মতই ছিল। তাঁরাই হয়তো গদ্যের মূল আবিষ্কর্তা–নিয়ানডার্থাল বা ক্রো মাইয়ঁ হয়ে ওঠারও ঢের আগে। আমাদের বিদ্যা-বুদ্ধি এখনও সে ইতিহাস পুনর্নিমাণের ক্ষমতায় পৌঁছয়নি। কখনও পৌঁছবেনা হয়তো।

যাক সে কথা, “আদি” শব্দের ব্যবহার নিয়ে আর্য ভাষায় যথেষ্ট দ্বিমত আছে। আদিরস কি সত্যিই আদিমতম রস? তা হলে বাল্মিকী আদি কবি কোন সুবাদে? তাঁরা কবিতার প্রয়োজন অনুভব করতেন হয়তো ঘুমপাডানি গান বাঁধার সময়।

নাকি ওঁ-কার আদিধ্বণি? সে সব ধর্মীয় কচকচি বাদ দিলেও, বর্তমান আলোচনা চালিয়ে যাবার যথেষ্ট সুযোগ আছে।আপনিও জানেন যে মানুষের আদিধ্বনিহচ্ছে ওঁয়া, বেড়ালর যেমন ম্যাঁও।

আদি হোক বা অনাদি,ভাষার কাজ হল “কমিউনিকেশন”। রোজকার ব্যবহারের ভাষাকে তাই ছন্দে বাঁধার চেষ্টা অনুচিত। শিবরাম অবশ্য একদা একটি তোতলা ছেলেকে গানে কথা বলতে উপদেশ দিতেন। তাতে নাকি তোতলামো হয়না। একবার কোনও নৌভ্রমণে ছেলেটির সাঁতার না জানা দিদি জলে পডে গেছেন। ছেলেটি গান গাইতে গাইতে জামাইবাবুকে বলল, “আমার দিদি, তোমার যে বউ, বলতে বেদন লাগে/জলে পডে গেছেন তিনি মাইল তিনেক আগে।”তিন মাইল মানে জলপথে প্রায় ঘন্টা খানেক তার লেগেছিল ছন্দ-মিলে বক্তব্যটা বাঁধতে। এফ়েক্টিভ় কমিউনিকেশন কিন্তু হলনা।আমি একটা বয়সে কিন্চিত তোৎলা ছিলাম, ভাগ্যিস আমার কোনও নৌবিলাসী দিদি ছিল না!

ধরে নিতে পারি যে হোমো স্যাপিয়েন্সপূর্ব লাঙ্গুলহীন বানর জাতির ঠাকুমা-দিদিমারা সন্ধ্যাকালে নাতি নাতনিদের যে “হাঁউ-মাউ- খাঁউ” শোনাতেন, তার ভাষা ছিল গদ্য। নির্ভুল পুনরাবৃত্তির সুবিধার্থে সাহিত্যর শুরুয়াত পদ্যে।

আমাদের বয়সকালে ভাষা শিক্ষার মূল উপায় ছিল, মানে না বুঝে ব্যাকরণের সূত্র মুখস্থ করা, দেদার বানান ও পরিভাষা মুখস্থ করা, পরীক্ষার খাতায় তা থেকে চূণ খসলেই শূন্যি।আপনি বা আমি বাঙলা গদ্য শিখেছি শুনে শুনে, লোকের মুখের ঠিক-ভুল-স্থানীয় লব্জ সব সমেত। ভাগ্যে তখন টি.ভি ছিল না, কিংবা মুঠো ফো়ন, থাকলে ভাষাটির শ্রাদ্ধ হয়ে যেত এতদিনে।

তা বলে পদ্যকে অবহেলা করবেন না দয়ালু মহাশয়েরা। পদ্যও গদ্যের মত জোরালো হতে পারে। উদাহরণ: তারাপদ রায় একবার লিখেছিলেন,”যে তারাপদ পদ্য লেখেন, সে তারাপদ অন্য,/ এ তারাপদ গদ্য লেখেন মদ্য খাবার জন্য”। অস্যার্থ, গদ্যের রোজগার পদ্যের চেয়ে বেশি।বিক্রম শেঠকে বাদ দিলে আধুনিক যুগে পদ্যে উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেনি কেউ।

গদ্য-পদ্য ছেডে দিন, ভাষাটাও সমস্যা।কোন ভাষা? আমার মাতৃ-নাকি গো-সন্তানদের মাতৃ, নাকি ইংল্যান্ডীয বৈদেশিক। চলিত না সাধু? আর পাঁচটা বাঙালির মত আমারও ধারণা ছিল, স্বাধীন ভারতে বাস করেন এমন ইয়োরোপীযরাই এবং বাঙলা চ্যানেলে যাঁরা সাহেবদের ভূমিকায় অভিনয় করেন তাঁরাই শুধু সাধু ভাষায় কথা বলেন। পূর্ব সীমান্তর মাগধী অবহট্ট থেকে সিধে চলিত বাঙলা এলে সকলেরই সুবিধে হত। তেমন সুবিধে হয়তো দেবী সরস্বতীর অভিপ্রেত ছিলনা, সাহেবদের সুবিধার্থে।মাঝে কিছুদিন অনিউরোপীয নবাব বাদশাদের মুখেও সাধু বাঙলা বসানোর চেষ্টা হয়েছে।তাতে অসাধুদেরও কোনও সুবিধে হয়নি।গদ্যেরও আবার রকমফের আছে।
রামমোহনের সাধু গদ্য আর ত্রৈলোক্যনাথের গদ্যে বিস্তর ফারাক।কঙ্কাবতী শিশু মানসকেও জাদু করেছিল।রামমোহন গল্প লেখেননি, কিন্তু গান তো লিখেছেন। সে gun- এর গুঁতো সাংঘাতিক।(আপনিই বিচার করুন, “মনে করো শেষের সেদিন ভয়ংকর,/অন্যে বাক্য কবে কিন্তু তুমি রবে নিরুত্তর কি ভালো শোনায়?)
আমাদের চুঁচডোতেও অন্তত চার রকম মৌখিক গদ্য চলে। সবচেয়ে পপুলার বেনে বাঙলা,সবচেয়েপুরনোও বটে। সেইযে তারা এককালে লাল শালুতে বাঁধা বালি কাগজের খাতায় লিখত,”ভরদ্বাজ গোস্ত্রস্য অভিরামস্য গোশালায তিনটি মূলস্থানি গাভী ও একটি বকনা পৌঁছাইয়া দিযা একুনে চৌদ্দটি তামার ও একটি স্বর্ণমুদ্রা বুঝিযা লইলাম।” তার মাহাত্ম্য যাবে কোথায়? ব্রাহ্নণদের চেয়ে তারা বিদ্যার বডো পৃষ্ঠপোষক।

তারা অলংকারের ধার ধারতনা না এ কথা ঠিক। তারা কখনও লেখেনি যে তার মধ্যে একটি গাভী সুলক্ষ্মণা ছিল, কিংবা, বকনাটি বাদামী ও সাদার মিশ্রণে নযনসুখকর ছিল, কিন্তু তিনটি তাম্রমুদ্রা যে খোঁটা ছিল,তা লিথতে ভোলেনি কখনও।তারা গণিতেও সরোগডো ছিল,নাহলে বাদামের মা, শশীর বিধবা সনকাকে মাসকরা সুদের হিসেবে ঠকাবে কি করে? তাই হুগলি-চুঁচডো জুডে তারা ঢালাও শিক্ষা ব্যবস্থা লাগু করেছিল। তাতে পাঁচজনের প্রভূত উবগার হয়েছে, সে কথাও ঠিক।একক সময তারা দলে দলে বুদ্ধের সংঘে যোগ দিয়েছিল, পরে চৈতন্যের বৈষ্ণব আখডায়। তাতে মাথা কামানোর খরচ বেঁচে গেল।

তারপর আসে শব্দচয়ন।তামাম হিন্দু ভারত যাকে প্যার বা প্রীত বলে, বাঙালির তাকে কোন আক্কেলে ভালোবাসা বলে?গদ্য নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। তাতে গদ্য জাত ওঠেনি। তবে মানুষ বুঝেছে, জন্মের শোধ বুঝেছে যে গদ্য ছাডা গতি নেই। বৃষ্টির সঙ্গে সৃষ্টি মেলে কিন্তু তারপর?দৃষ্টি-অনাসৃষ্টি, র.না.ঠার অপছন্দের কৃষ্টি।ব্যস।

বাঙালি ক্রস বর্ডার ভাষা শিখতে চাযনি তাই হয়তো তাদের ক্রস বর্ডার প্রেমের ইতিহাস নেই। হ্যায় যোগ করলেই যখন কায হয়, শিখে কই হঅবে?

বাঙালি সংস্কৃতও ভালো শেখেনি, তাই তাদের পান্ডিত্যের পরিধিও সীমিত। কিন্তু দরকার মত বাঙালি আরবি ফার্সিশিখেছে, ইংরেজি বা ফরাসি শিখেছে, তাই বা কম কি?

আমার কলেজ জীবনে ও প্রথম যৌবনে কিছু বন্ধু খলিল জিব্রানের গদ্য খুব পছন্দ করতেন।সেই না ঘাটটা না ঘরকা গদ্য আমার কখনো সুবিধার লাগেনি, যেমন লাগেনি শেষের কবিতা। মনে হত মেকি। কিন্তু র.না.ঠা’র ডাকঘর নাটক কিন্তু সুখপাঠ্য ও সাচ্চা।

উইন্স্টন চার্চিল আমার একান্ত অপছন্দের মানুষ–শুধু তিনি ভারত-বিদ্বেষী বলে নয়, তাঁর ইংরেজি গদ্য এমন কি ভালো, যাতে তিনি নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন? অথচ আমাদের বাঁডুজ্জেরা (বিভুতি, তারাশংকর ও মাণিক দেশেও অপরিচিত থেকে গেলেন। বাঙালিা তাঁদের তেমন মনে রাখেনি। অন্যদিকে শিক্ষিত সজ্জন কিছু বাঙালি, শরদিন্দুর নোবেল অ-প্রাপ্তিতে বিরক্ত। শরদিন্দু ভালো গদ্যকার ছিলেন, ঠিক, কিন্তু গদ্যের জন্য তো নোবেল নেই। তাঁর গল্প-সাহিত্য চলচ্চিত্রজগতের উপরে উঠতে পারেনি।

মুন্সি প্রেমচন্দও অনুরূপ উপেক্ষিত।ওড়িশা-আসামেও তেমন কেউ কেউ আছেন। দ্রাবিড় দক্ষিণ নিয়ে ধারণা খুব কম, তবু কত না-পাওয়া নোবেল সেখানে আছে, আন্দাজ করতে পারি।

পুরস্কারের আশা ছেডে গদ্যের অবয়বটা দুচোখ মেলে দেখুন। গদ্যের যথার্থ সংজ্ঞা হয়না, অবশ্য কবিতা বা পদ্যেরও হয়না। অনেক ভাবলে যেটা মাথায আসে, তা হল, ” দুই বা ততোধিক মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক ভাব বিনিময়ের জন্য বাকযন্ত্রের সাহায্ শ্রুতি গ্রাহ্য সংকেতাবলী।” ভাষায়ও সেই একই সংজ্ঞা। তাই হল না হল না, ফেল। তা ছাডা লিখিত গদ্য বাদ পড়ল।তবে”অর্থপূর্ণ আদানপ্রদান। গা টেপাটেপি বা অপাঙ্গ ইঙ্গিতও কি গদ্য?গদ্য তাহলে অসাংজ্ঞিক কমিউনিকেশন । তাহলে টেলিপ্যাথ়রা কি গদ্য বোঝেনা? নতুন বইতে যে কাগজ কালির গন্ধ, কিন্ড্লে তা নেই । নতুন ফ়োনের গন্ধ কি ইঙ্গিতবাহী নয?

গদ্যের নানান রকমফেরের মধ্যে আছে অপিশিয়ল গদ্য (learning from the burning ghat…), চটুল গদ্য (তোমার চোখে চোখ রাখতে পারিনা, সম্মোহিত হয়ে যাই), বানান ভুল গদ্য (পৌলমী, কাল তুমি ফোন তুললে না, তবু আমি বিশ খাইনি, আজ বিকেলে টালিগঞ্জস্টেশন যাব, ওপারে দেখা হবে), ব্যাকরণ ভুল গদ্য (শ্বাশুডিমা আমাকে কখনও মেনে নেবে না— আমার সঙ্গে যা হচ্ছে তাকিয়ে সবার সঙ্গে হয?)

Read Full Post »