Feeds:
Posts
Comments

ঠিক দুক্কুরবেলা, যখন ভূতে মারে ঢেলা, চারদিক শুনশান, বাবুরা আপিসে, কাকিমা-মাসিমারা নিদ্রালু, দূর থেকে শোনা যেত ডাহুকের নালিশ, প্রেম-পাগল কুকুরদের ভৌভৌকার, শিলকাটা ইশানের ডাক, সাত-সতেরো পাখ-পাখালির হঠাৎ  চেঁচামেচি৷ কর্তৃপক্ষের নিষেধ সত্ত্বেও গ্রাম থেকে ঘাসুরেরা কাস্তে দিয়ে লনের ঘাস কেটে নিত নির্জনতার সুযোগে৷ লাফঝাঁপ থেকে নির্বাসিত আমি সান-বারান্দায় দাঁড়াতাম এসে, হাতে হয়ত রাজকাহিনী কিংবা সিংখুড়োর গপ্পো, মনটা বাইরের বিস্তারে৷ দেখতাম, রাজ্যের কাক এসে জড়ো হচ্ছে পাশের ব্লকের ছাতে, মিটিং হবে এবার, লোকসভা-বিধানসভার মত ভয়ানক চেঁচামেচি৷ বিচার হচ্ছে কোনও গুরুতর আইনভঙ্গকারী বায়সপুঙ্গবের৷ ওদের বিচারব্যবস্থা গণতান্ত্রিক এবং দ্রুত; নিষ্পত্তি হয়ে গেলে তক্ষুনি শাস্তি হয় অপরাধীর — ঘাতক কাকেরা সাংঘাতিক ঠোকরায় তাকে, অন্যেরা রোমান সার্কাসের হৃদয়হীন দর্শকের মত ছিছিৎকার করে আর ডানা ঝাপটিয়ে ঘাতকদের উৎসাহ দেয়৷ না-হওয়া প্রাচীরের ওপাশে, সবুজ-হলুদ দাবাছক খেতে, পাখমারারা কি যেন বলে চেঁচায়৷…

“ছেলে ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো, বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?” জমিদারের খাজনা দেবার সময়ই কি শুধু বর্গি-বুলবুলির অজুহাত? না বোধহয়৷ এস্টেটের বাড়িতে ঢোকার সময় ইয়ং-সাহেবের ঢেউখেলানো পাঁচিল সম্পূর্ণ হয়নি; সীমানার ওপারে বিস্তীর্ণ ধান খেত, মুসুর খেত, সর্ষে  খেত  দেখা যেত, দেখা যেত সেই দিগন্তবিস্তারী সবুজ-হলুদ ঢেউয়ের মাঝখানটিতে আম-কাঁঠাল-বাঁশঝাড় ঘেরা ছোট্ট একটা পটে আঁকা গ্রাম, ছায়াঘন, অসিত হালদারের জলরঙের মত৷ ফসলের সময় রাজ্যের পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসতো কোথা থেকে, তবে খাজনালোভী বুলবুলিদের দেখেছি বলে মনে পড়েনা৷ পাখমারারাও উদয় হত আকাশ ফুঁড়ে

বাংলায় চুয়াড় নামে একটা আদিবাসী জাত আছে, নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে সাঁওতাল-মুন্ডাদের সমগোত্রীয়৷ তাদেরই নামে আমরা না ভেবে বলি চোয়াড়ে  স্বভাব, চোয়াড়ে  চেহারা, চোয়াড়ে  ভাষা৷ এদের এক শাখা এই পাখমারা; নামেই পরিচয় — পাখি মারা তাদের পেশা৷ দীর্ঘকাল ধরে চাষি-গেরস্তদের ফসল রক্ষা করত তারা; রামের মিত্র গুহর মত কাঁধে ধনুক, তুনীরে তিরের বদলে কোমরে গোঁজা কেঠো মাথার ভোঁতা বাঁটুল, পিঠের ঝুলিতে জাল৷ আর থাকত ভীষণদর্শন মুখ আঁকা কেলে হাঁড়ি — নরম মাটিতে ডাল পুঁতে মাথায় চড়িয়ে দিলেই খাসা কাকতাড়ুয়া! এ ছাড়া ক্যানেস্তারা পেটানোর সরঞ্জাম৷ বাবা বলেছিলেন ওরা নাকি যাযাবর: খেতিকাজের সময় এখানে, বছরের বাকি সময় কোথায় থাকে, কি করে, কে জানে! পাঁচিল উঠে যাবার পরে আর দেখিনি তাদের, তবে বড় হয়ে কেতাবে পড়েছি৷

গোবিন্দ নামের পাখমারাটার বছর পনেরো বয়েস, দীঘল রোগাটে শরীর, খাকি হাপপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরা ধূসর চেহারা৷ ট্রাইসাইকেল চালাতে দেখে ঝোপ পেরিয়ে এপারে এসে ভাব করেছিল; তার মুখটা এখনও মনে পড়ে৷ বয়েসে আমার চেয়ে বড় হলেও আমাকে ভালো লেগেছিল তার, আমারও তাকে৷ কারণ ছিল৷ সেযুগে অস্ট্রেলিয়া থেকে ক্রাফট চিজ আসতো কাচের গেলাসে; প্রথম দিনই তাকে দিয়েছিলাম আমার বরাদ্দের টুকরোটা, তার পর থেকে মংঘারামের বিশকুট কিংবা কমলালেবু-আপেল৷ তাছাড়াও মা তাকে দুধ দিতেন, ঘরে তৈরি কেক দিতেন৷ জঙ্গলে পাওয়া যায়না সেসব, তাই সে আগে কখনও খায়নি৷ বলেছিল, জঙ্গলে  আম-জাম-কাঁঠাল তো আছেই, খেত বাঁচানোর মজুরি স্বরূপ ছালা বোঝাই চাল-ডাল-নুন-তেল আছে, বন ভরা পাখি-খরগোশ-সজারু আছে, দিব্যি কেটে যায়৷ “ধ্যাৎ, সজারু খাস কি করে, অত কাঁটা!” সে আমার অজ্ঞতায় মজা পেত: “ছাল ছাড়ালেই সজারু তো খরগোশ, শ্যালের ভয়ে ওরা কাঁটা পরে থাকে, তাও জানিসনা!” … গোবিন্দদের ডাক পড়ত ধান বেড়ে উঠলে, তারপর কাজ ফুরুলে পাজি, যাও, চরে খাওগে! কাজ ফুরুলে যে পাজি হয় সে শিক্ষায় আমার সেই হাতেখড়ি; অনেক পরে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি ৷

আমার সেই স্নিগ্ধ, ছায়াময় আই.ও.কিউ.-এর কাছে এস্টেটের চেষ্টাকৃত শহুরেপনা ফিকে মনে হত বহুকাল৷ কালে কালে সেখানে বাস্তুর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেল, প্রায় আকন্ঠ ভরে গেল ইয়ং-সাহেবের পূর্বপরিকল্পিত সীমারেখা৷ দু-দুটো ক্লাব হল — তার একটায় সুইমিং পুল, স্কোয়াশ কোর্ট, চেনা স্পোর্টস গ্রাউন্ডের বদলে আনকোরা মাঠ, নতুন বাজার, লেডিজ পার্ক, তিন ভাষার তিনটে আলাদা স্কুল৷ তবে সেখানে আমার বহুকালের চেনা সেই জোনাকিদের দেখিনি কখনো, যদিও দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল সর্বদাই ৷ … সম্প্রতি অনেক দিন জনশূন্য ছিল সেই এস্টেট, ঋকবেদের হরিযুপিয়ার ধ্বংসাবশেষের মত ফোকলা দরজা-জানালা, লুঠ হয়ে যাওয়া আলো-পাখা-কল; তবে ছিল৷ দু-একবার জি.টি.রোড দিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার সময় দূর থেকে  দেখতে পেতাম৷ ইদানীং শুনি নতুন মালিক, হিসেব মিলিয়ে চতুর্থ পক্ষের,  সেই সব ইমারত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, হয়ত যাতে আগামি দিনের কোনও রাখালদাস, কোনও মার্শাল, একটা ইটও খুঁজে না পায়; যাতে আবার অক্ষতযোনি কুমারী হয়ে ওঠে গোটা অঞ্চলটা; তাকে যথেচ্ছ রমণ করতে উদ্ধত লিঙ্গের মত সারি সারি বহুতল গজিয়ে উঠবে হয়ত সর্বত্র, লোভে চকচক প্রোমোটারের চোখ, লকলকে কামাসক্ত জিভ তাদের!

সেই জোনাকিদের কম খুঁজেছি নাকি!

ভাইয়ের যখন দশমাস বয়েস, মায়ের শরীর সারাবার জন্য দার্জিলিং গেলাম সকলে৷ মলের এক প্রান্তে এলিস হোটেলে উঠেছিলাম৷ সুধীদা, সুধীরঞ্জন দাস, সুপ্রিম কোর্টের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি এবং পরে বিশ্বভারতীর উপাচার্য, সস্ত্রীক উঠেছেন ঠিক আমাদের পাশের কামরায়৷ অন্যত্র গৌরী দেবী আর গৌতম, মহানায়কের (তখনও শুধুই নায়ক) স্ত্রী ও আমার প্রায় সমবয়সী তাঁর পুত্র৷ তাঁরা এসেছেন, এবং উইন্ডামেয়ারে না উঠে ‘অনুত্তম’ এলিসে উঠেছেন, কারণ গৌতমের জলবসন্ত৷ স্কুল-কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়েছেন একুশ দিনের মত ছেলেকে ‘অন্য কোথাও’ নিয়ে যেতে৷ সেই ‘অন্য কোথাও’, অভিভাবকদের বিচারে, কলকাতার স্বগৃহ না হয়ে দার্জিলিঙের ‘হোটেল এলিস ভিলা’৷ সঙ্গে আছে নায়কের সেক্রেটারি, জনৈক শম্ভু৷ এসব কথা, জানাজানি হবার আগে, গৌতমই বলেছিল আমায়; তখনও তার চুমটি পড়েনি৷ অগত্যা, সুধীদার নির্দেশক্রমে এবং, আমার না-হোক, আমার দশমাসের কচি ভাইটার খাতিরে, আমরা সারাদিন যথাসম্ভব বাইরে বাইরে কাটাতাম৷ … তখনও দার্জিলিং এখনকার মত ঘেয়ো, বাক্সসর্বস্ব, ঘিঞ্জি শহর নয় — খোলামেলা মল, স্টেপ-আ-সাইড দিয়ে নেমে গেলে বেহেশতের ঠিকানা৷ সারাদিনের ভাড়া করা টাট্টু নিয়ে, অথবা পদাতিক, আজ এ-রাস্তা কাল ও-রাস্তা চষে বেড়াতাম৷ সন্ধে বেলা ক্যাপিটলে সিনেমা, ইংরেজি ছবি থাকলে৷ জীবনানন্দের হালভাঙা নাবিকের মত, বাচ্চা নাবিক, বিদিশা-শ্রাবস্তী-দারুচিনি দ্বীপ দাপিয়ে বেড়াতাম সারাদিন৷ বাবা-মা-ভাই তখন স্যানাটোরিয়ামে শান্তিনিকেতনের বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন৷ … আমার গতিপথে সরল গাছের বন ছিল অনেক, ছায়াঘন, তার ফাঁকে ফাঁকে অনেক সম্ভাবনাময় ঝোপজঙ্গল; খেলনা-মাপের বাঁশঝাড়; শেওলায় সবুজ পাহাড়ের গা, জ্যান্ত গাছের গুঁড়ি আর আলগা পাথর; পাহাড়ি ফুল ঝুমকোলতার মত নতমুখ ফুটে থাকত থোকায় থোকায় — সেসব বিচিত্রবর্ণ ফুলের ছবি জল রঙে আঁকলে বিশ্বাস করবে না কেউ! কথায় কথায় উড়ো মেঘ এসে ওড়নায় ঢেকে দিত তাদের অবয়ব৷ এমন জায়গায় খুব মানাত সেই জোনাকিদের, তবু কোত্থাও তাদের দেখিনি!

পুরীর সামুদ্রিক হাওয়ায় জোনাকিরা উড়ে যায়; ঘিঞ্জি গলির অন্ধকারে, হৃদয়হীন পাথরের মন্দিরে তাদের মানায় না৷ কলকাতার বড় রাস্তায় বড্ড বেশি আলো আর নিরালোক গলিঘুঁজিতে দুটো মানুষই পাশাপাশি যেতে পারেনা, কয়েক কোটি জোনাকি তো কোন ছার! দেওঘরে জুগনু  ছিল অনেক, বমপাস-টাউনের সার সার অবহেলিত দালান-কোঠার জঙ্গুলে বাগানে, পেয়ারাতলায়, অস্পৃষ্ট আতা-নোনার ফলসম্ভারে, হাস্নাহানা আর যুইঁয়ের সুগন্ধী ঝোপের আড়ালে, কিন্তু বিহারী জোনাকি তারা, আমার চেনা কেউ নয়৷

যেখানেই যাই, মনে হয়েছে, “হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনওখানে!”

কোথায় খুঁজবো তাদের, কোন নিরুদ্দেশে? শান্তিনিকেতনে তারা ‘ইচ্ছে হয়ে ছিল মনের মাঝারে’, কিন্তু গুরুপল্লী বা শ্রীপল্লীতে নয়, ছেলেবেলাতেও নয়৷ তখন চাকরি করছি কয়েক বছর৷ সুবীর, আমার স্থপতি সুহৃদ, তখন আমার সহকর্মীও৷ লাটবাগানে তার বিভাগের ভাড়া করা ফ্ল্যাট ছিল আমাদের বাড়ি থেকে দুমিনিটের হাঁটা পথ, তবু আমাদের সঙ্গেই তার থাকা-নাওয়া-খাওয়া৷ আমার আত্মীয়েরা, পারিবারিক ও বিবিধ বন্ধুরা, তারও খুব পরিচিত হয়ে গেছে তত দিনে৷ এক সঙ্গে দিল্লি বেড়াতে গিয়ে আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি উঠেছিলাম একবার, এবং তাঁদের যথেচ্ছ জ্বালিয়েছিলাম দুজনেই, নির্দ্বিধায়, নিঃসংকোচে৷ অসাধারণ মেধাবী ছিল সুবীর; অধীত বিদ্যা ছাড়াও যান্ত্রিক-বৈদ্যুতিক-বৈদ্যুতিন কারিগরিতে; হাতেগড়া মডেল বিমানের বেতার উড়ানে; প্রাচীণ, ফেলে দেওয়া, ডগলাস মোটরসাইকেল দুশো টাকায় কিনে, তিন মাসের মধ্যে স্বহস্তে সারিয়ে তুলে, স্টেটসম্যানের ভিন্টাজ কার প্রদর্শনীতে যোগ দেওয়ার প্রকল্পে; দুনিয়ার কল্পবিজ্ঞানের গল্পে তার জুড়ি মেলা দায়৷…কারখানায় দোল-হোলি মিলিয়ে দুদিন ছুটি থাকত৷ সত্তরের দশকের শুরুর দিকে একবার তার মোটরসাইকেলে (ডগলাসের চেয়ে তরুণতর অন্য এক দেশি মডেল) হঠাৎ, উঠলো বাই তো, শান্তিনিকেতন চলে গেলাম দুজন, দোলের আগের দিন বিকেলে, উঠলাম দাদির শ্রীপল্লীর বাড়িতে, অনাহুত, কিন্তু পরম আদরে ডেকে নিয়েছিলেন দাদি, আমার মায়ের দিদিমা, তাঁর স্বভাব-সুলভ স্নেহে৷ তিনি যে ছিলেন সকল আশ্রমবাসীর ঠানদি!

পরদিন দেখি ‘খোল দ্বার খোল’-এর মিছিলে মালা এবং দর্শকের ভূমিকায় আমার কলকাতার বন্ধুবান্ধব বেশ কয়েকজন৷ মালা আছে মানে, দেখা না গেলেও, অতীনও আছে কোথাও৷ তখনও দোলের শান্তিনিকেতনে যারা যেত তারা সম্পর্কের টানেই যেত, যেত ভালোলাগা আর পরিচয়ের নেশায়, গড়িয়াহাট বা শ্যামবাজার পাঁচমাথার হুল্লোড় সঙ্গে বয়ে নিয়ে যেতনা৷ ভালোই হলো, কারণ আমার সমবয়েসী চেনা স্থানীয়দের দেখা পাইনি সেবার, তাই অমিতাদি সেদিন রাত্রে খেতে বলাতে আগেই বিনা ওজরে রাজি হয়েছিলাম৷ … অবেলায় কালো করে এসেছিল আকাশ; হবি তো হ, পরিক্রমা শেষ হতে-না-হতে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি নামল৷ বৃষ্টি ধরতেই অতীন বলল, “চ, কোপাই দেখবি চ”; দল বেঁধে গিয়ে দেখি রক্তের নদী বইছে — সে দৃশ্য আগে কখনো ঠাহর করে দেখিনি, সে ভাবে দেখার মনটাই তৈরি হয়নি হয়ত৷ সাধে কি আনন্দ বাগচী তাঁর কবিতায় “আলতার শিশি ভাঙলো, কোপাই কি শান্তিনিকেতনে” লিখেছিলেন! … অমিতাদির বাড়ি ডিনার মানে কাঁটায় কাঁটায় আটটা, তাই ঠিক হলো ছটার সময় মিলব সবাই চৈতির সামনে৷

সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে অমিতাদির বাড়ির উলটোদিকের খোয়াই, শ্রীপল্লীর রাস্তার ওপাশে৷ এখন সেখানে বিস্তর দোকান, আপিসঘর, নির্জনতা কেড়ে নিয়েছে; তখন সঙ্গীত-কলার ছাত্রাবাসটা ছিল বোধহয় — ছাত্রাবাস হিসেবে নয়, অতিথিশালা হিসেবে৷ কাঁকুরে মাটিতে গোল হয়ে বসলাম সবাই, তৃষিত মাটি তখন বৃষ্টির সব জল নিঃশেষে শুষে নিয়েছে৷ অর্জুন গলা ছেড়ে “আশায় আশায় ভালবাসায়, তোমার নাকি বিয়ে হবে” গাইল, আমরা হাত তালি দিয়ে হাসলাম সবাই; তারপর এ-কথা সে-কথা, এ-গান সে-গানের পর নয়না বলে একটি মেয়ে, আগে কখনও দেখিনি তাকে, পরেও নয়, “পূর্ণ চাঁদের মায়ায়” গাইল অসামান্য তৈরি গলায়৷ সে দেখতে কেমন, কি তার পরিচয়, এসব ভাবিনি৷ কন্ঠ দিয়ে সে একটা মায়ার জাল, পূর্ণ চাঁদের মায়ার জাল, বুনেছিল — যে চাঁদটা তখন স্নাত আকাশে একটা সরল প্রতীকের মত জ্বলজ্বল করছে; যে চাঁদটা পূর্ণ হলেও আশৈশব আমি বলতাম ‘পুরনো’ চাঁদ, চির চেনা, তবু নতুন চাঁদ ফি-পূর্নিমায় নতুন করে ওঠে, বসন্ত পূর্নিমায় আরো নতুন যেন! কোপাই তখন অনেক দূরে, দৃষ্টির আড়ালে, কিন্তু কল্পনায় তার রাঙা জলের ছলাৎছল শুনতে পাচ্ছিলাম৷ সেই মায়া, চাঁদের আলো আর সুরের মূর্চ্ছনা-মাখা সন্ধ্যায় আসা উচিত ছিল তাদের, তবু সেই জোনাকিরা আসেনি৷

আগে এক সময়ে এভরো-৭৪৮ বিমানের অনেক উড়ান ছিল দক্ষিণ ও পশ্চিম উপকূলে, লাফানে উড়ান, দুই বা তিন লাফে গন্তব্যে পৌঁছোত৷ তেমনই একটা উড়ানে মাদ্রাজ থেকে ব্যাঙ্গালোর কিংবা কোচিন যাচ্ছি একবার — সম্ভবত তিরুপতি ছুঁয়ে৷ তড়িঘড়ি উঠেছি বলে নম্বরহীন উড়ানে ডানদিকের শেষ লাইনে জানালার সীট পেয়ে গেছি, অন্যটা খালি — ব্রীফকেসটা  রেখেছি সেখানে৷ সে  বয়েসে অবশ্যই আশা করতাম কোনও সুন্দরী সেই খালি আসনটা দখল করবেন হয়ত, কিন্তু মধ্যপথে উঠলেন এক দক্ষিণী ভদ্রলোক, মাঝবয়সী; আমাকেও বিরক্তিভরে বাক্স কোলে নিতে হলো৷ বিমান ছাড়তে না ছাড়তে ভাব জমাতে শুরু করলেন৷ তিনি নাকি দেবরাজ আর্সের (তখন কর্ণাটকের মুখ্য মন্ত্রী) পোষা গণৎকার, এবং, তাঁর গণনায়, আর্স অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী হবেন অদূর ভবিষ্যতে! আমার কার্ড চাইলেন৷ তারপর শুরু হলো আমার নামের অক্ষরগুলো দিয়ে নিউমেরোলজির ব্যাখ্যান৷সাতকেলে অবিশ্বাসী, সেই আমাকেই শোনাচ্ছে ভূত-ভবিষ্যতের সাতকাহন! অতীতের দশটা কথা বললে, কে না জানে, চার-পাঁচটা মিলবেই৷ “তোমার জীবনে একটা বড় আঘাত এসেছিল” (পিতৃবিয়োগ, এটা কাকতালীয় কিন্তু সত্যি)৷ “অল্প  বয়েসে খুব বড় চাকরি কর তুমি” (আমার কার্ডেই তার হদিস)৷ কিছুর মধ্যে কিছু নেই, হঠাৎ বললেন, “আরো বড় আঘাতের জন্য তৈরি থেকো, পঞ্চাশের কাছাকাছি, প্লাস-মাইনাস তিন!” এটা মোক্ষম এবং মজাদার ভবিষ্যৎবাণী, তায় আবার হবু প্রধানমন্ত্রীর খোদ গণকের মুখনিঃসৃত, স্বকর্ণে শুনেছি বলেই মনে ছিল৷ হাড়ে হাড়ে তার যাথার্থ্য টের পেয়েছি অনেক পরে ৷

জটিল রাবারের অণু বিস্তর ঘেঁটেছি; দরকার মত নির্দ্বিধায় ম্যানিপুলেট করা যেত তাদের, রামের সঙ্গে রহিমের ভাগ্য মিলিয়ে দিয়ে অচিন্ত্য নতুন গুণাবলী আরোপ করেছি অনায়াসে৷ মানুষ জাতটা রাবারের অণুর চেয়ে, আগেই জানতাম, অনেক অনেক বেশি জটিল, তবে অঙ্কের না হোক সমাজতত্বের নিয়ম তো মানে! কিন্তু কর্মীদের যারা অঙ্গুলিহেলনে চালায়, সেই মালিকপক্ষ ও তার সাক্ষাৎ প্রতিনিধিরা, এই অধমও যার বাইরে নই, তারা সেই পাঁচ হাজার মানুষের চেয়েও বেশি জটিল, ডি.এন.এ.’র জোড়া ইশক্রুপের প্যাঁচের ওপর কয়েক গুণ! চড়াইয়ের রাস্তায় শত্রুর সংখ্যা বাড়ে, তাও জানতাম৷ যাদের উপকার করেছি তারাই যে বেশি শত্রু হয় তাও, বিদ্যেসাগর-মশায়ের দৌলতে, অজানা নয়৷ তবে চেনা মানুষ, কাছের মানুষও যে কোথায় নামতে পারে তা বুঝিনি মোটেই৷ নিউমেরোলজিস্টের কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম কিন্তু ১৯৯৩এর শেষের দিকে, যখন আমার বয়েস সাতচল্লিশ, বিরোধীদের চাপে এবং বৃহত্তর দায়িত্বের নামে, নবকলেবর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ — রণাঙ্গনে যাঁদের দেখা দায় কিন্তু হোমারের গ্রীক দেবতাদের মত মরণশীল মানুষের বাঁচামরা  যাঁদের হাতে — রাতারাতি কলকাতায় বদলি করলেন আমায়, নেই-সাম্রাজ্যের এক্কা গাড়ির ঠুলিআঁটা ঘোড়াটার ভূমিকায়৷ হেড আপিসে ঠাইঁ হলো একতলার টয়লেটের পাশের ঘরটায়, যেটা আগে ছিল কোম্পানি সেক্রেটারির কাগজপত্রের গুদাম৷ সেখান থেকে অবশ্য বাহুবলে সর্বোচ্চ তলার একটা ঘর দখল করেছিলাম আবার৷ সেসব ব্যাখ্যান নয়, আঘাতের ব্যাপারটা বোঝানো দরকার এখানে৷সেই জোনাকিদের থেকে বহু দুরের একটা হাঁপিয়ে ওঠা, রং চটা, যক্ষাগ্রস্ত শহরে নির্বাসন আমার মত লোকের কাছে দ্বীপান্তরের চেয়েও বৃহত্তর আঘাত৷ ১৯৯৪এর শেষের দিকে মুক্তির দরখাস্ত দিলাম, ১৯৯৫এর ফেব্রুয়ারিতে একতৃতীয়াংশ বেতনে যোগ দিলাম অন্যত্র৷ তারপর আর কারখানার চৌহদ্দির ছায়া মাড়াইনি কখনো৷

যতই নির্লিপ্ত হই, খেদ থেকে যায়৷ পঞ্চিপিসির খোঁজ করিনি আর৷ চোংকারদের এক মেয়ে, ইলা (তার দিদি, শীলা, ভারতসুন্দরী হয়েছিল একদা), আমাদের সঙ্গে পড়ত আন্টি ডি’ক্রুজের এলেবেলে স্কুলে, বড় হয়ে বিমান বালিকা হয়েছিল — একটা উড়ানে তার ফোন নম্বর দিয়েছিল পুরনো দিনের খাতিরে, দেখা করিনি৷ সুভাষ কুলকার্নির সঙ্গেও আলাপটা ঝালাইনি৷ সে সবই আমার দোষ, মানি৷ চুয়াড় জাতির প্রতিভূ গোবিন্দ সেই এক ফসলের পর আর আসেনি৷ ঘরে তৈরি ‘রাজাভোগ, পান্তুগোল্লা’ খাবার নিমন্ত্রণ করে ফটিকবাবু চিরকালের জন্য চলে গেলেন৷ ‘আলতার শিশি ভাঙা’ খোয়াইয়ের পূর্ণিমায় নয়না আর কোনও দিন গান শোনালোনা৷ সুবীরের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ হয়েছিল ইদানীং — সেটা দেখা-সাক্ষাতে পরিণত হওয়ার আগেই সে তড়িঘড়ি চলে গেল নিরুদ্দেশে, তর সইলনা৷ সেই জোনাকিরা যে ফিরে এলোনা আর৷ সেসবও কি আমার দোষ?

Reblogged from aniruddhasen:

We had no television or FM radio. The powers-that-were frowned at too much play. Books, perforce, were our only option as everyday indoor (and alfresco) entertainment. In the era of so many alternative distractions and parental pressure for school and an array of useless extra-curricular activities to let them (the parents) keep up with the Joneses, are children missing the fun of growing up with their imagination tickled pink and honed razor-sharp?

Read more… 11 more words

This is worth reblogging for my friend Subir's comments. I shall miss him, though we hadn't been in touch for a decade and one half except over the rare phone calls and rarer mail dialogues.

Reblogged from aniruddhasen:

I was born during the uneasy interval between the cessation of World War II and independence, when much of the world around me was bent double on empty stomach. All those who found gainful employment in the various opportunities that the war had opened up – short service commission in the military, civil supplies, order supply contracts, civil and structural contracts – were frantically looking for cushy jobs after being de-mobbed or dismissed.

Read more… 562 more words

This is from the last month of 2010 but unvisited and remains relevant for a reblob, perhaps.

মাস্টারমশাইদের কেউই ইহজগতে নেই আর: ফটিকচন্দ্র কুমার, শিশির সেনগুপ্ত,  মীনাদি-রীনাদি দুই বোন, হাসিদি, সুষমাদি, আরো কেউ কেউ বাদ গেলেন হয়ত৷ সহপাঠীদের মধ্যে এক দীপালী বাঁড়ুজ্যে ছাড়া কারু সঙ্গে যোগাযোগ নেই৷ মায়া সুরের সঙ্গে একবার পথ চলতি দেখা হয়েছিল, তাও বছর কুড়ি আগে: ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে দারুন কবিতা বলত মায়া, “কাঠবিড়ালি, কাঠবিড়ালি, পেয়ারা তুমি খাও?” মায়ার জ্যেঠামশাই, মোহিনীমোহন, ব্যান্ডেল চার্চের উল্টোদিকে সেন্ট জন’স স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন; কেহ বা কাহারা তাঁর ঘাড়ে কাটারির কোপ মেরেছিল, জব্বর কোপ, অনেক ভুগে বেঁচে গিয়েছিলেন সেযাত্রা! তাঁর স্কুলে উনিশ দিন পড়েছিলাম, হুগলি কলেজিয়েটে ভর্তির অপেক্ষায়৷

সুজিত বল সে-আমল থেকেই আমার প্রাণের বন্ধু, এখনোও তাই, তবে সে বাংলা স্কুল ছেড়ে গিয়েছিল বাঁশবেড়ে স্কুলে৷ দু-দুটো হালকা হার্দিক ধাক্কা সামলে এখনও সে বহাল তবিয়তেই আছে, দেখা সাক্ষাত হয়৷ গীতা নন্দি আর মীনা পোড়েল, বয়েসে কিছুটা বড়, তবে  আমাদের সঙ্গেই পড়ত; দুজনেরই বিয়ে হয়ে যায় স্কুলের গন্ডি পেরুতে না পেরুতে৷ মীনা তার পরেই আত্মহত্যা করে: কারণটা কখনও অনুসন্ধান করিনি তবে সহজেই অনুমেয়৷ দুই কৃষ্ণার একজন, ভট্টাচার্য, ছেলে হতে গিয়ে মারা যায় কাঁচা বয়েসে; অন্য কৃষ্ণা, চক্রবর্তী, আর তার দুই ভাই, শঙ্কর (ক্লাসের একমাত্র ছেলে যে ড্রইংএর বদলে সেলাই করত মেয়েদের সঙ্গে) ও সমরও কোথাও হারিয়ে গেছে৷

নতুন এস্টেটে ঝোপ-জলা-জঙ্গলের খামতি ছিলনা, বর্ষায় জোনাকিও ছিল বিস্তর, তবু দিওয়ানা কবি হাফেজের মত হা-জোনাকি যো-জোনাকি করে সেই জোনাকিদের খুঁজতাম৷ সারাক্ষণ বললে মিথ্যে বলা হবে, মাঝে মাঝে মন খারাপ হলে, অথবা আচমকা মনে পড়লে৷ তখনই বোঝা উচিত ছিল, কবি হওয়ার আসলি বীজ আমার ভেতর নেই!

পিটর মাইকেলের পৈতৃক সাকিন ছিল বর্তমান ঝাড়খন্ডে, যত দূর জানি বুনডুর মুন্ডা বংশে৷ তার জ্যেঠা ছিলেন কারখানার কর্মচারী, তখন চার্জহ্যান্ড, পরে ফোরম্যান৷ পিটর নিঃসন্তান জ্যেঠা-জেঠির কাছেই মানুষ এবং অমানুষ হচ্ছিল৷ ৮৪ একর  জঙ্গলের হাঁড়ির খবর জানত সে: কোথায় ঘুঘুদের আস্তানা, কোথায় কুন্ডুদের পরিত্যক্ত শিব মন্দির — যেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করলে গুপ্তধন মিলতে পারে, কোথায় লিচু পেকেছে কিন্তু জমাওয়ালার জাল পড়েনি এখনও৷ একটা সময় আমার সঙ্গে জমেছিল খুব, বোধহয় আমার এআর রাইফেলের দৌলতে৷ জঙ্গলের সব খবর রাখত সে, তবে সেই জোনাকিদের নিশ্চয়ই চিনতনা, সেই উল্টোনো জবার মত, গহন সমুদ্রের উজ্জ্বল আর বেপথু জেলিফিশদের মত, ফিসফিস করে কথা বলা জোনাকিদের; চিনলে কি আর বলতনা আমায়? উঠতি অবস্থার জ্যেঠা-জেঠি ভালো বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়েছিল তাকে, পিটর তাঁদের বংশে গৌরব আনবে প্রথম! কিন্তু অদৃষ্টের রসিক দেবতা আরেকবার হাসলেন: স্কুল থেকে কোথাও পিকনিকে গিয়ে সাঁতার কাটছিল সে, জলের নিচে চোরা পাথর তাকে রেয়াত করেনি৷

কানাই পিটরের চেয় বেশি জঙ্গুলে ছিল: ঈশ্বরবাগে তাদের বাড়িতে গেছি একবার, তার মা বললেন, “ঘরে নেই, দেখোগে উত্তরের পুকুরে ডালঝাঁপ খাচ্ছে হয়ত”৷ উত্তরের পুকুর তো বুঝলাম, কিন্তু ডালঝাঁপ কি ভালো খেতে? পানিফলের মত জলে ফলে? গিয়ে দেখি, একটা গাছের ডাল পুকুরের প্রায় সমান্তরাল হয়ে ঝুঁকে রয়েছে; কানাই তাতে চড়ছে আর জলে ঝাঁপাচ্ছে৷… আরেকবার কানাই আমায় ডিম ষষ্ঠীর নিমন্ত্রণ করেছিল৷ আর সব ষষ্ঠীর নাম শুনেছি, তা বলে ষষ্ঠী আর ডিম! পেঁয়াজি পেয়েছ? সেদিন সরস্বতী পুজোর ভাসান, স্কুল ছুটি৷ যথাসময়ে গিয়ে শুনি, শ্রীপঞ্চমীর পর দিন সরস্বতীর বাহনের খাতিরে ষষ্ঠী; ঘরে পোষা হাঁসের ডিম সেদ্ধ, আলু সেদ্ধ, কুমড়ো সেদ্ধ দিয়ে গলা ভাত খেতে হয়, ছেলেমেয়েদের সে-সব খাইয়ে তবে মা সেই পাতে খাবে৷ গরিব হলে সর্ষের তেল আর কাঁচা লঙ্কা চলতে পারে! মাটির অত কাছে থেকেও কানাই সেই জোনাকিদের দেখেনি৷ বড্ড গরিব ছিল কানাইরা, পড়াশুনো চালাতে পারেনি; শুনেছি, ঈশ্বরবাগেই দোকান দিয়েছিল একটা৷

শা’গঞ্জের বাংলা স্কুলে ছটা মাত্র ক্লাস৷ কথা ছিল বছর বছর এক-একেকটা ক্লাস বাড়বে, কিন্তু অর্থ এবং স্থানাভাবে সেটা শুরুতে মেয়েদের জন্য শুধু৷ কাজে ৫৭তেসপ্তম ক্লাসে উঠে শহরের স্কুলে যেতেই হলো৷ একে বেপাড়ার, তায় বেড়ে ক্লাসে ধেড়ে ছেলে! বয়েসটা একটু কম বলেই বিপত্তি বেশি; প্রতিষ্ঠা পেতে লড়াই করতে হয়েছিল রীতিমত৷ সেসব কথা কিছু কিছু আমার  হুগলি কলেজিয়েট স্কুল-এর ব্লগে আছে, কৌতুহলী পাঠক  খুঁজে দেখতে পারেন৷ যেসব কথা সেই ব্লগে বলা হয়নি, তার মধ্যে আশরফির গল্পটা জরুরি হয়ত৷ জরুরি আর কি, সে অবশ্যই, জোনাকি নয়, তবে তেমনই অধরা কিছু একটা খুঁজত৷ কলেজিয়েটের গেটের বাইরে, টিপিনের এবং ছুটির সময়, খোলা-শুদ্ধ বাদাম, ছোলা ভাজা, ঝাল ছোলা, ছোলা টোপার ঝুড়ি নিয়ে বসত সে; অন্য সময় টাউন ক্লাবের মাঠে কিংবা নদীর ধারে৷ একদিন, ক্লাস সেভেনেই হবে কারণ সেটা ছিল ইলেকশনের বছর, ১৯৫৭, মাস্টারমশাইরা ভোটাভুটির ট্রেনিঙে গেছেন সব, হাপ ছুটি, কোম্পানির ফিরতি বাস আসতে আসতে সেই সাড়ে চারটে৷ কি-করি কি-করি করতে করতে ষাঁড়েশ্বরতলা ঘাটে বুড়ো বটের ছায়ায় গিয়ে বসেছি, দেখি আশরফি পৈঠায় ঝুড়ি নামিয়ে উদাস চোখে গঙ্গার স্রোত দেখছে, চারদিক শুনশান – জনমনিষ্যি নেই৷ সেই থেকে বুড়োর সঙ্গে আমার গলাগলি ভাব৷

দেশে থাকতে রুজি রোজগার ছিলনা, ওইটুকু খেতির ফসলে অতগুলো লোকের চলে! অগত্যা চাচার কাছে নৈহাটি৷ এসে দেখে, চাচার কামাই বিস্তর, তবে হারামের কামাই, ডাকা ডালনেকা পয়সা! চাচার দলেই শেষমেশ ভিড়ে গেল আশরফি, তখনই তার দেড়কুড়ি দুকুড়ি বয়েস, বাঁজা বউটা মরে বেঁচেছে৷ চাচার এক নম্বর বেওসা নৌকোয় যাত্রী পারাপার৷ রাত হোনেসে সেই নৌকো নিয়েই অভিযান: চরেরা খবর আনত; খবর বুঝে কোনও দিন এখানে, কোনও দিন সেখানে, মাসে কমসেকম দো-তিন রোজ ডাকা ডালতা থা চাচার দল৷ গেরস্ত সজাগ থাকলে বা বেগতিক বুঝলে কাজ হত না; সে-সব দিন মেজাজ টঙে তুলে দারু খেত চাচা আর লাল-লাল চোখে আশরফিকে গাল পাড়তো৷ ভাগের বেলায় কিন্তু অষ্টরম্ভা: কখনো সিকিটা কখনো আধুলিটা, কখনো শুধুই  রক্তচক্ষু!

একা আশরফি ধরা পড়েছিল সেবার, সেই একবারই এবং শেষ বার৷ কাল বাদে পরশু যে বাড়িতে বিয়ে, গয়নাগাঁটি, নগদ টাকা, বেনারসি, কাঁসা-পেতলের বাসন তো থাকবেই, বাড়ি ভর্তি কুটুমও থাকবে;  সে সব জেনেই তো আসা! সচরাচর বন্দুক দেখালেই কেঁচো হয় যায় লোক, মেয়েছেলেরা চোখের জল ফেলতে ফেলতে হাহাকার করে কিন্তু নিজের নিজের গলার হার, কানের পাশা, হাতের বালাও ঠিক স্বেচ্ছায় খুলে দেয়৷ সেদিন, সেই ছোকরি, যার  কাল বাদে পরশু বিয়ে, তারই গায় গলায় হাত দিল চাচা!

— ”কি সুন্দর মেয়েটা, খোকাবাবু, কি নিষ্পাপ সুন্দর, তোমাকে কি করে বোঝাই! তোমার তো বোঝার বয়েসও হয়নি; তা ছাড়া আমার দিলে যা হচ্ছিল সেটা বলবার মত ভাষা আমার নেই৷ নরম চাঁপা রঙের মেয়েটার মুখে চোখে ইজ্জতের ভয় এখনো চোখ বুঝলে দেখতে পাই৷ আমি বারবার চাচাকে মনা করছিলাম, হাত ধরে টেনেও ছিলাম, সেই দেখে মেয়েটা কেমন তাকিয়েছিল আমার দিকে, হয়ত আশ্বাস চাইছিল৷ কি করে ভুলি!

“মেয়েটার কোনো আত্মীয়, হয়ত ভাইয়া, চাচাকে ছাড়াবার চেষ্টা করছিল; ধস্তাধস্তিতে এমন হয়ে গেল কি খালেদের হাতের বন্দুকসে গোলি ছুটে গেল আর মরলো সেই ভাইয়া৷ মেয়েটার গায় হাত দিচ্ছে চাচা? আমার গুসসা হলো৷ হতভম্ব খালেদের বন্দুকটা কেড়ে নিয়ে চাচাকে ঝেড়ে দিলাম৷ সবাই দেখল কিন্তু বিচারের সময় সে কথাটা বললনা কেউ, বললে কিছু কম সম সাজা হত হয়ত একটা খুনের জন্য! ধরা পড়লাম আমি একা, বাকি সব এ তল্লাট থেকেই পালালো, গয়নাগাঁটি নিয়ে৷

“আমার উমর কয়েদ হলো৷ আঠেরো মাস রেমিশন নিয়ে সাড়ে বারো বছর খেটে বেরিয়ে এই সাতদস সাল বাদাম বেচছি৷ভাইয়াটা তো মরেই গেল; মেয়েটা আছড়ে পড়েছিলো তার ওপর, আমি এখনো দেখতে পাই৷ “

— “কি দেখতে পাও, আশরফি?”

— “আমি সেই মেয়েটাকে দেখি৷ বিচারের শেষ অবদি, জানি, তার বিয়ে হয়নি৷ তার পর তার কি হলো? হিন্দুরা কি আর বিয়ে দিতে পারবে?… সে কোঠিতে তারা আর থাকেনা, খোকাবাবু, আমি দেখে এসেছি৷”

— “তুমি কি তাকে দেখতে চাও?”

— “এসব কথা বোঝার বয়েস তোমার হয়নি, খোকাবাবু৷”

আমার নিজের দিলের ভেতরকার যে আকুতি, সেই জোনাকিদের জন্য যারা দেখা দিয়ে হারিয়ে যায়, তার কথা তো আশরফি জানত না, জানার কথাও নয়, কাউকে এতদিন বলিনি সে কথা!

১৯৫৪ থেকে ১৯৬৫ ওই ১১৬ নম্বর ছিল আমাদের ঠিকানা, হাল সাকিন ও অভয়াশ্রম৷ তার মধ্যে ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ কাটিয়েছি কলকাতায় — যে শহরটা এখনও আমার নিজের হলনা — পড়াশুনোর অজুহাতে৷ সেই নতুন এস্টেটেই আমার যথার্থ বয়ঃপ্রাপ্তি, ছেলে থেকে লোক হয়ে ওঠার প্রথম সোপান৷ কিন্তু, সুধী পাঠক, আমি পিটর প্যানের মত চিরকিশোর থাকতে চেয়েছিলাম৷ যে ভগবানকে কখনও মানিনি — তার দিব্যি, নতুন স্কুলের বেনেবাড়ির ছেলেরা যেমন বাঁ হাত দিয়ে একবার কণ্ঠা একবার চোখ ছুঁয়ে দ্রুত লয়ে বলত, “Sত্যি মাইরি, মা কালির দিব্যি, চোক ছুঁয়ে বলছি, গণেs মানত”, সেই রকম দিব্যি গেলেও বলতে পারি, “আমি বড় হতে চাইনি, চাইনি, চাইনি!” ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ কলকাতার কলেজে, কিন্তু টিকি তখনও শা’গঞ্জে৷ তখনকার কথা আছে আমার কফি হাউসের ব্লগ পোস্টে৷

দীর্ঘতর সময়, হয়ত পাকাপাকি, চিরকাল, পরবাসে কাটানোর কথা ছিল, পাখির ছানা যেমন উড়তে শিখলে নিজের মনেই অন্য কোথাও চলে যায়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে  জীবনের বন কেটে নিজের বসত  বসায়৷ আমি নিজে এবং চেনাশোনা সকলেই তাই ভাবতেন, কিন্তু অদৃষ্টের রসিক দেবতা মৃদু হাসছিলেন তখনও! আমি লায়েক হবার আগেই আমার পূজনীয় পিতৃদেব সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে ফেলে সটকে পড়লেন ১৯৬৫র জুলাইতে৷ পয়সাকড়ি কিছু রেখে যাননি বলবনা, তবে এমনই তাঁর ইহলৌকিক জ্ঞান যে জীবিত কাউকে নমিনি করেননি! সেই থেকে শা’গঞ্জের ঘানিতে পাকাপাকি জুতে গেলাম৷ বিদ্যে সামান্যই, বুদ্ধি তথৈবচ, অনেকটাই পিতৃবিয়োগের আহা-বেচারা  সমবেদনা, বাকিটা লিখিত পরীক্ষা আর নির্দ্বিধার ইনটারভিউএর খাতিরে সেই কারখানাতেই চাকরি হলো একটা, তিন বছরের ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি৷

চেনা মানুষ, বিশেষ করে বাপের চেনা মানুষদের সঙ্গে কাজ করার হ্যাপা অনেক: একে তো বয়স্করা বাজে বকে বেশি, তায় পদে পদে গঠনমূলক তুলনা ও সমালোচনা!

—  “আর্য সেন বিরাট পন্ডিত ছিলেন, তোমার মতো ফাঁকিবাজ না৷”

—  “এই যে তুমি ক্ষীরোদ করের চায়ের দোকানে চ্যাংড়া ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা মারো, এটা কি আর্য সেনের ছেলের পক্ষে শোভন?”

—  “তুমি কি শেষমেষ সত্যিই অনার্স পেয়েছিলে, নাকি? সেনবাবু তোমার পরীক্ষার মধ্যেই মারা গিযেছিলেন না??”

ততদিনে আমরা ১১৬ ছেড়ে সান-বারান্দাহীন ১৬৯ নম্বরে উঠে গেছি,  বলা ভালো নেমে গেছি, এবং অচিরেই সেখান থেকে আরও নেমে সাবেক শা’গঞ্জ-কেওটার টায়ারবাগানে, গোবিন্দ ঘোষের সন্তোষ কাসটে, কারণ বিজ্ঞপিত ইংরেজি গৃহপরিচিতির শেষ দুটো অক্ষর খসে গিয়েছিল৷ সেখান থেকে আবার লাটবাগানে, সুহাস সেনগুপ্তর নামহীন গৃহে, সন্তোষ-কাসলের মত নিস্প্রদীপ নয়৷ সুহাসবাবুর এক ছেলে, সুরজিত, বাংলার ফুটবল দুনিয়ায় স্বনামধন্য, আর এক ছেলে প্রতিষ্ঠিত ভূতত্ত্ববিদ ও আমার সমপাঠী; সহপাঠী নয় কারণ সে পড়ত ব্র্যানচ স্কুলে৷ বহুদিন আগে জ্যোতিষ (যতীশ?) কাকা প্রায় জোর করে বাবাকে কিনিয়ে দিয়েছিলেন একটা প্রমাণসই জমি, জলের দরে, বড় রাস্তার ওপর এবং, জনধারণায়, কেওটার তখনকার রইস-তম পাড়ায়, যেখানে চক্ষুবিদ নীহার মুনশির নিজের এবং তাঁর আত্মীয়বর্গের বাড়ি৷ অদূরেই ভাগীরথী সতত প্রবাহমানা, ব্যানডেল চার্চ চারশো গজ,  স্টেশন তিন মাইলের কম, কারখানা আধ মাইল! ১৯৬৮তে, এসটেট ডিউটি দিয়ে সাকসেশন সার্টিফিকেট পাওয়ার পর,  বাবার মৃত্যুজনিত কারণে প্রাপ্ত ও কিঞ্চিত সঞ্চিত অর্থে একটা ভদ্রাসন তৈরি হলো সেখানে, আমার পরম বন্ধু, পরে আমার সাতাশ বছরের সহকর্মী, সদ্য পরলোকগত স্থপতি সুবীর সেনগুপ্তের নকশায়৷নকশাটা অনন্য বলা যাবেনা কারণ কনট্র্যাকটর টোগু বাবু, যিনি সুবীরের সন্ধান দিয়েছিলেন, আমাদের বাড়ি তৈরির বছর দুই আগে প্রায় একই নকশার আরেকটা বাড়ি বানিয়েছিলেন চন্দননগরে, সুবীরেরই ডিজাইনে; ট্রেন-চলতি দেখা যেত এবং ডেলি-পাষন্ডদের নানান আলোচনার বিষয় ছিল সেটা৷…

মিল কন্ট্রোল ল্যাবের জটা গাঁজারু এবং কোকেন-সেবী ছিল তো বটেই, তবে সদ্য মিক্স করা রাবার কমপাউন্ডগুলোর মনের কথা শুনতে পেত সে; রিওমিটার যন্ত্রে না চড়িয়েই স্পর্শে, চর্বণে, দলনে ও ঘ্রাণে সে তাদের ভিসকসিটি, অন্তত দুটো তাপমাত্রায় স্কর্চ সেফটি, কিওর টাইম, কিওর রেট ইত্যাদি হুবহু বাতলে দিতে পারত; বিশ্বাস না হলে মিলিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ ছিল — কখনও জিততে পারিনি৷ পাকে-চক্রে দেখা গেল, আহা-উহু  সমবেদনা ছাড়া আমারও একটা কিছু ঐশী ক্ষমতা আছে৷ রাবার (কল-চলতি ভাষায় রবাট, কারখানার ডাকনাম ‘রবাট কল’, আমরা সব ‘রবাট কলের কুলি’) নামক পলিমারগুলোর বিশাল অণুরা আমার কথা শুনত৷ সত্যি, প্রায় বিনা চেষ্টায়, রেসিপি দেখে বা উদ্ভাবন করে, স্ট্রাকচার বুঝে, প্রণিধানযোগ্য স্থাবর ও জঙ্গম প্রপার্টিগুলো অক্লেশে বলে দিতে পারতাম, ভবিষ্যত-দ্রষ্টার মত! হয়ত তারই জন্যে অচিরাত ফ্যাক্টরি টেকনিকাল ছেড়ে গবেষণাগারে জায়গা হলো আমার, নতুন গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগে৷ অথবা, বলা ভালো, গবেষণাগার গুলোর সরকার স্বীকৃত আর এন্ড ডি-তে উত্তরণ হলো যৌথ প্রচেষ্টায়, তাতে আমার দায়ভাগ ছিল অনেকটা৷ ১৯৭৩ সাল, পশ্চিম এশিয়া সংকট এবং ওপেক সংগঠনের অর্থনীতি নিংড়ানোর শুরুয়াত৷ কাজেই আমার করে-দেখানোর বিস্তর বিষয় ছিল৷ তারপর আর ফিরে দেখিনি কখনো; শুধু বিভাগের মাথা হয়ে ওঠার আগে বিদেশ থেকে একটা দুটো খেতাব আর পিঠচাপড়ানি  অর্জন করতে হয়েছিল৷

অদৃষ্টের রসিক দেবতা এবার অট্টহাসি হাসলেন! রামপ্রসাদ গোয়েঙ্কা তাঁর সদ্য বিশ পেরুনো ছোট ছেলে সঞ্জীবের জন্য ভারতীয় কোম্পানিটা কিনে নিলেন; সহ-ক্রেতা নাম-না-জানা কে এক মানু ছাবরিয়া৷ বিলিতি হোল্ডিং কোম্পানির হাঁড়ির হাল, আগেই শুনেছি; এখন লীড ব্যাংকার, বার্কলে, ঋণের বোঝা লাঘব করতে গোটা কোম্পানিটা টুকরো টুকরো করে বেচে দিল, এ-দেশের কসাইরা যেমন করে অনায়াসে জনসমক্ষে মাংস বেচে৷ নতুন মালিকদের কি মতলব কে জানে! ১৮৮৮ সালে বার্মিংহাম শহরে যাত্রা শুরু করেছিল যে দিশারী প্রতিষ্ঠান, ভারতে যার নথিভুক্তি ১৮৯৮তে এবং শা’গঞ্জে কারখানা স্থাপন ১৯৩৬ সালে, বণিকের মুদ্রানিক্বণে তার খাসি করা মাংস বিক্রি হলো, হঠকারিতায়! আমার ব্যক্তিগত ভাগ্য কিছুটা স্তিমিত হলেও তখনও ঊর্ধমুখী৷ তারও পরে গজ-কচ্ছপের লড়াই শুরু হলো, গোয়েঙ্কার ‘গ’ + ছাবড়িয়ার ‘চ্ছ’: গোয়েঙ্কা-ছাবড়িয়ার দখলদারির লড়াই৷ অস্যার্থ, শা’গঞ্জ কারখানায় অভূতপূর্ব ৯৭ দিনের ধর্মঘট৷ পয়সার খেলা, বোঝাই যাচ্ছিল, কিন্তু কার পয়সায় দুটির মধ্যে অন্তত একটি ইউনিয়ন এই আত্মঘাতী খেলায় মাতল, সেটা বুঝতে সময় লেগেছে৷ এই কারখানাকে লোকে বলত মহীরূহপ্রতিম শিক্ষণ সংস্থা; ভারতময় তুল্যমূল্য অন্য প্রতিষ্ঠানে শা’গঞ্জে-কাজ-শেখা উচ্চ মার্গের লোকেদের রাজত্ব৷ সেই সংস্থা কিনা খাসি হয়ে গেল!

স্ট্রাইক মিটল, তবে গোয়েঙ্কারা পাততাড়ি গোটালো, বড়-শরিক ছাবড়িয়ার হাতে লাগাম ছেড়ে দিয়ে৷ যাবার সময় অনেকটা রস নিংড়ে নিল আর টোপ ফেলে গোটা প্রতিষ্ঠানের বাছা বাছা লোকদের নিয়ে গেল নিজেদের প্রতিষ্ঠানে৷ আমি যাইনি; আমার কৈশোরের গোকুল, যৌবনের বৃন্দাবন ছেড়ে কোথায় যাব? কাতলার গাদা ইলিশের কোল / তপসে ভাজা পাবদার ঝোল  (দখনে প্রবাদ)৷ মাছ শিকারের নেশা ছিল আগে, কিন্তু মাছে-ভাতে বাঙালি নই; তাই কাতলা-তপসে-পাবদার খবর জানিনা৷ ইলিশটা অবশ্য পছন্দ করি (চিংড়ি-কাঁকড়াও, তবে সেগুলো মাছ নয় বলে বোধহয় দখনে ছড়ায় পাত্তা পায়নি) এবং নিশ্চিত জানি, শা’গঞ্জ ছিল প্রতিষ্ঠান কুলের ইলিশ! চিবিয়ে ছিবড়ে করে ফেলা ইলিশের কাঁটার মত কারখানার ছিবড়েটুকু পরে রইলো তারপর৷ প্রতিষ্ঠান চালায় মানুষ; এক-আধ জন নয়, অনেকের সমাহারে এক বিশাল মানুষের দল, সর্দার ও পুরোহিত সমেত সতেরোর ‘ক’ থেকে উনসত্তর ‘ঙ’, যারা যন্ত্রাংশের মত নীরবে নিজের নিজের কাজ করে যায়৷ ঘড়িতে যেমন দম দেওয়া স্প্রিং, প্রতিষ্ঠানের তেমনি দম-দেওয়া জান-কবুল-করা মানুষ, মানব সম্পদ৷ সেই দম ফুরিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানে আমাকে লাথি মেরে আবার ওপরে তুলে দেওয়া হলো, প্রথমে শা’গঞ্জের দন্ডমুন্ডের কর্তা, পরে কলকাতার হেড আপিসে, ক্রমক্ষীয়মান রাজত্বের একরাট রাজা!

(আগামী পর্বে সম্ভাব্য সমাপ্তি)

[The previous episodes of this blog were written in English for hardware exigencies, a language I am not too comfortable in. I have switched my allegiance in favour of Bengali now that I have the means. Feeling comfortable with a tongue is half the battle of communication, not that I expect to get a sizeable audience in these days of general alienation, considering my age and the seemingly measured distance I had maintained with my acquaintances, friends and relatives. I didn't intend to measure, or even keep, the distance; it was just that I was built that way. Or, perhaps, the fireflies had subtly altered my psyche, unbeknownst to me, for the worse.

I have freely drawn references from the previous episodes: that may be a bit cumbrous for the reader, if any. I honestly seek your indulgence, if, dear reader, you have come thus far!]

শা’গঞ্জের নামকরণ হয়েছিল বাংলা-বিহার-ওড়িশার মুঘল শাসক শাহ আজ়িমের নামে, যাঁর পোশাকি নাম আজ়িম-উশ-শান৷ প্ৰথম বাহাদুর শাহের ছেলে তিনি, ঔরঙ্গজ়েবের নাতি৷ কোনো যুদ্ধে একদা শিবির ফেলেছিলেন এই তল্লাটে৷ তার আগেও বর্ধিষ্ণু ছিল গ্রামটা, বাঁশবেড়ের মত সাবেক সাতগাঁর এক গাঁ, তবে আগে তার নাম কি ছিল তা নিয়ে অনেক সংশয়৷ সরস্বতী মজে যেতেই সাতগাঁর হাঁড়ির হাল৷ বর্ধিষ্ণু বেনেরা মালকড়ির খোঁজে সাতগাঁ ছেড়ে চাটগাঁ (তৎকালীন পোরটুগিজ বানানেও প্রায় একাকার নাম দুটো: Catgao আর Catigao), ঢাকা, মালদা, মুর্শিদাবাদ, মায় কলকাতায় ছড়িয়ে গেল৷ চতুষ্পাঠী টোলগুলো তার পরের শিকার: এক বাঁশবেড়েতেই চল্লিশ ঘর টুলো উপাধ্যায় ছিল বলে কানাঘুষো৷ ইংরেজ আমলে আজ়িমের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল পাবলিক, সেই সুযোগে জায়গাটার নাম হয়ে যায় সাহাগঞ্জ — কয়েক ঘর স্থানীয় সাহা যারা ছিল তারা সে-নামের দাবি রাখেনি কখনও৷ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দেবযান  উপন্যাসে শা’গঞ্জই লিখেছেন, শা’গঞ্জ-কেওটা, কেওটা মানে কেওট (কৈবর্ত) পাড়া৷ তা লিখতেই পারেন, একদা কিছুদিন এ-তল্লাটে ছিলেন তিনি, অপুর কিশোর বয়েসে; প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের পাঠশালা নাকি এখানেই ছিল!

সেনাশিবিরের দৌলতে শা’গঞ্জ-বাঁশবেড়ের সঙ্গমে, যার নাম এখন খামারপাড়া, গড়ে উঠেছিল একটা বেশ্যালয়৷ সৈনিক আর বেশ্যা, দেবসেনাপতি উভয়েরই আরাধ্য: সেই সুবাদে, পাঁজি দেখে নয়, কৃত্তিকা নক্ষত্রের নামে যে কার্ত্তিক মাস, তার শেষ দিনে এখনও ধুমধাম করে হয় কার্তিকেয়ের পূজা, বারোইয়ারি উদ্যোগে৷ তাও একটা দুটো নয়, গণনাতীত! কাত্তিক ঠাকুরের চেহারার রকমফের দেখে ধাঁধা লেগে যায়: খোকা কাত্তিক, ধেড়ে কাত্তিক, দরওয়ান কাত্তিক, এক-কানে-দুল-পরা ঢলানে কাত্তিক (সম্ভবত গে !), বরাঙ্গনা বারাঙ্গনা-পরিবৃত লম্বা-জুলপি কানে-মাকড়ি হাতে-লোহার-বালা কোমরে-ভোজালি মাচো  কাত্তিক, এবং দেবানন্দ-ব্রুস লী মার্কা কাত্তিকও দেখেছি৷ এখন হুজুগটা হুগলি-চুঁচড়ো এবং বাকি বাংলায় ছড়িয়ে গেছে৷ আর গৃহস্থের বাড়ি নামাঙ্কের সন্দেহজনক পাড়াটা আমার স্মরণকালেও ছিল!

আই.ও.কিউ.-এর অবস্থান শা’গঞ্জের উত্তর-পূর্ব কিনারায়৷ ইংরেজি আদ্যক্ষরের নামটা কোম্পানির দস্তাবেজে অনেক পরে দেখেছি, জনসাধারণ তখন বলত বারো কোয়াটার ৷ গেট থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়ে ডানদিকে কিছুটা গেলে কারখানার ফাটক৷ বাঁদিকে খামারপাড়া — প্যালেস বোর্ডিং — তার উল্টোদিকে গন্ধেশ্বরী ঘাট৷ সেসব উজিয়ে বাঁশবেড়ে৷ বাঁশবেড়ের ওবাগে দেবরায়দের বাসুদেব আর হংসেশ্বরীর মন্দির৷ মন্দিরের আশেপাশের ময়রারা খাসা মাখা-সন্দেশ বানায় — তেমনটি আর খেলামনা! তারপর, দরাপ খাঁ গাজির ঢিপি পেরিয়ে, ত্রিবেণী৷ সেই খাঁসায়েব — তুর্কি জ়াফর খাঁ গাজ়ি (ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতক?) — যিনি শেষ জীবনে ভুলভাল সংস্কৃতে গঙ্গাস্তোত্র লিখতেন৷ জাতধম্মের অত্যাচার চরমে পৌঁছনোর আগে অবশ্যই সম্ভব ছিল সেটা, আজ হলে এম.এফ.হুসেনের দশা হত! বাঁশবেড়ের মাঠে রথের মেলা বসত তখন: থালার মত বড় পাঁপড়ভাজা আর দাঁতভাঙা গুজিয়া-কটকটি খেয়ে, চাকাওয়ালা মালসার ওপর ব্যাঙের চামড়া লাগানো দড়িটানা খ্যাঁচকাঠির ট্যামটেমি, কিংবা টিনের চোঙের দুপাশে নকল চামড়া আঁটা ঢোল, এবং বাঁশের-কাঠির-ওপর সাঁটা মৃগিগ্রস্ত তালপাতার সেপাই কিনে বীরদর্পে ঘরে ফিরতাম৷…

আমাদের বারো নম্বর বাড়িতে সোফা-সেটি; সেন্টার টেবিল; পেক্স স্টুল; দম দেয়া বাক্স গ্রামোফোন (রেড উডের বডি, হিনজ করা ডালার মাঝখানে প্রভুর বশংবদ সারমেয়ের ছবি, চোঙ্গার বদলে বাক্সের মাঝখানে একটা তসরে ঢাকা চৌকো অংশ — বাবার ভাষায় গ্লাস-ডায়াফ্রাম স্পিকার (সেটা যে কি জন্তু তা কে জানে!), নিচে রেকর্ড রাখার জায়গা; মায় আমার চেন-ওয়ালা বিলিতি ট্রাইসাইকেল — সবই ছিল, জীবনানন্দের ভাষায়, “ব্যবহৃত, ব্যবহৃত, ব্যবহৃত …”, বিদায়ী সাহেবদের থেকে কেনা৷ শুধু আমার দুলুনি ঘোড়াটা আনকোরা; অবরে সবরে সেই ঘোড়ায় পালা করে দুলত সবাই, সমবয়স্ক কারু জন্মদিনে বাক্স-গ্রামোফোনটার চাহিদা ছিল খুব!

আই.ও.কিউ.-এর চত্তরে বারোটা একতলা বাড়ি, মেলাই ছেলেমেয়ে, তার মধ্যে আমার কাছাকাছি বয়েসের বিজগুড়িরা আধ ডজনের বেশি তো বটেই! আমি মধ্যরাত্রির সন্তান-দের চেয়ে এক গর্ভবাস কাল বড়, বাকিরা কম-বেশি৷ আমরা ক-জন আন্টি ডি’ক্রুজ়ের এলেবেলে স্কুলে যেতাম, শম্ভুর মাসকাবারি রিক্সায়; মাঝেমাঝে পাগলা সুন্দরলাল তার বদলি খাটত৷ সুন্দরলাল সত্যিই পাগলা: শরৎসরণির অন্ধকারে হিসি করতে নেমে ডানহাতে সাপের ছোবল খেয়েছিল; বাঁহাতে বিষাক্ত সাপটার ফনা মুঠিয়ে ধরে, রিক্সা চালিয়ে, সোজা কোম্পানির হাসপাতাল! অন্যেরা যেত কোম্পানির বাংলা স্কুলে, পঞ্চিপিসির সঙ্গে, পদাতিক৷ পঞ্চিপিসির ছেলেছাঁট চুল ও পরনের কাপড় দুইই সাদা৷ ছোটখাটো মানুষটা ঝুঁকে পড়লেও শক্তপোক্ত৷ প্রত্যেকটি ক্লাস ঝাড়পোছ, হেডমাস্টারের নোটিস এ-ক্লাসে ও-ক্লাসে চালাচালি আর সময়মত ঘন্টা বাজানো ছিল তার কাজ; পরীক্ষার সময়ে ওপর টেইম!

খোলা আকাশের নিচে, সবুজ-দেয়াল সবুজ-গালিচার খেলাঘরে, বেমিশাল আনন্দ ছিল তখন: স্বাধীনতার আনন্দ, বড়বেলায় যার খোঁজ পাইনি আর৷ রঙন ফুলের মধু চুষতাম আমরা, বড়কাকিমাদের লংকা জবারও৷ মৃত্যুঞ্জয় মুখার্জির যমজ মেয়েরা, বড়ি আর ছুটি, বলত, “কলকে ফুলের মধু খাসনি, বেজায় বিষ!” আমরা তাও চুষতাম৷ হাঁটুতে মার্কিউরোক্রোম, কনুয়ে মার্কিউরোক্রোম, কখনও সখনও লাল ওষুধের বদলে গাঁদা পাতার হাতে-ডলা রস, কারুকারু কপালে স্টিকিং প্লাস্টার (ব্যান্ড-এড তখনও হয়নি), আলুথালু চুল, প্যান্টের বাইরে শার্টের লেজ, ধুলোমাটি মাখা তো ছিলই!

সে সব ছেড়ে যাওয়া সহজ!

তবু ছেড়ে যেতে হলো, যেতে হবে তাই৷

নতুন এস্টেটের সামনে দিয়ে একটা চওড়া রাস্তা, লিঙ্ক রোড , কারখানার গেট থেকে বেরিয়ে পূব-পশ্চিম নাক বরাবর জি.টি. রোডে পড়েছে৷ পূব দিক বাদ দিলে তিনদিকেই এক-ইটের দেয়াল, সাইন কার্ভের মত ঢেউ খেলানো, যাতে হাওয়ায় পড়ে না যায়: আর্কিটেক্ট ইয়াং সাহেবের অনবদ্য সৃষ্টি৷ তাঁর ছেলে জন আমাদের সঙ্গে পড়ত, থাকত সাহেবদের জন্য বরাদ্দ কমপাউন্ডে — বিলাসের অমরাবতী৷ … লিঙ্ক রোডের (রাস্তার নামগুলো — ক্যাজুয়ারিনা ওয়াক, ক্যানা এভেনিউ  ইত্যাদি — মদীয় পিতৃদত্ত) উত্তরে দোতলা বাড়ি সব, নিচে দুটো ওপরে দুটো ফ্ল্যাট; ঠিক সার বেঁধে নয়, গায়গায়েও নয়, জায়গাটার  ভূগোল মেনে, যথাসম্ভব গাছ না কেটে, সন্তর্পণে উপস্থাপিত, যাতে খামোখা খটকা না লাগে৷ তার পাঁচটার সব ফ্ল্যাটে একটা করে বাড়তি সান-বারান্দা ছিল, বাড়ির পেছনে বিশাল বাগান৷ তারই একটা দোতলার ফ্ল্যাট — ১১৬ নম্বর — পিতৃদেবের নামে৷ বাড়িগুলোর সামনে পায়ে চলার জন্য ইটের রাস্তা, লিঙ্ক রোডের সমান্তরাল; তা থেকে সমকোণে গৃহাভিমুখী অনুরূপ রাস্তা প্রত্যেক বাড়ির সামনের লম্বাচওড়া লনগুলোকে দ্বিখন্ডিত করছে৷ মেহেদির বেড়ায় ঘেরা লনে আমরা বড়-হয়ে-যাওয়া খেলা খেলতাম: ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, পিট্টু, আর ট্রাইসাইকেল সজোরে চালিয়ে পেছনের একটা চাকা শূন্যে তুলে দ্বিচক্র ব্যালান্সের খেলা৷ ওই লনে আমি বাইসাইকেলও চালাতে শিখি: ম্যানজ়েল এঞ্জেলো আর স্টিভেন পেটরোজ়া আমার এক রাশ কমিক ধার নিত — পড়তে যতক্ষণ লাগে, তাদের ১৬ ইঞ্চি সাইকেল ততক্ষণ আমার৷ ফ্ল্যাট গুলোর পেছনে, বাগান আর নয়ানজুলি পেরিয়ে স্কাউটস’ ডেন, সেটা পেরিয়ে আরো কিছু নির্মীয়মান কোয়ার্টার আর ৮৪ একর সদ্য কেনা অনাঘ্রাত জঙ্গল৷ কুন্ডুদের জায়গা ছিল আগে, তখনও ছিল তাদের চাকর-মহলের ধ্বংসস্তুপ এবং খিড়কির মজে আসা পুকুর — লোকে কুন্ডু পুকুর বলে৷ সেখানে আমরা গুপ্তধনের খোঁজে বিস্তর খোঁড়াখুঁড়ি করতাম৷ আমার ন-বছরের জন্মদিনে মা কিনে দিয়েছিল একটা ডায়ানা এয়ার রাইফেল, ভেরি এক্সপেন্সিভ (২৫ টাকা!) তবে লিডারশিপের জন্য দুর্দান্ত৷ আমার ভাই আমার চেয়ে প্রায় দশ বছরের ছোট; তার জন্মের সময়, ১৯৫৬তে, বাবা দিলেন বয়ঃপ্রাপ্ত ২৪ ইঞ্চি এভন সাইকেল, আজ মনে হয় হয়ত ঘুষ হিসেবে৷ এ-দুএর মণিকাঞ্চন যোগেও আমার ভবিষ্যত নায়কত্ব পাকা হলনা!

১৯৫৪র মাঝামাঝি থেকে আমরা নতুন এস্টেটের ১১৬ নম্বরে৷ জনডিসের জন্য প্রায় একবছর গৃহবন্দী থাকার পর ১৯৫৫র জানুয়ারিতে কোম্পানির বাংলা স্কুলে ভর্তি হলাম, পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ক্লাস ফাইভে৷ মলয় বাদে ক্লাসের সব্বাই পুরনো, কিন্তু আমার কাছে বুলটু, পতাকী, শঙ্কর, জাপান, পাঁচুগোপাল কান্ডি, দুই দীপালী, চম্পা, ছন্দা, আরতি, প্রণতি — আনকোরা নতুন৷মলয় করও আমার মত সেবারই ভর্তি হলো কলকাতা থেকে এসেশুধু টাইফয়েডে বেদম ভুগে নতুন করে ভর্তি হলো আলো বলে একটা মেয়ে — আলো মজুমদার; স্বভাবতই তার সঙ্গে আমার ভাব হলো বেশি৷ কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে ভাব করে লাভ নেই: তারা ফুটবল-ক্রিকেট-ডাঙ্গুলি-লাট্টু খেলতে চায়না, পারেওনা, অগত্যা…! বলতে দ্বিধা নেই, আমার প্রাণের বন্ধু ছিল কানাই হালদার — ঈশ্বরবাগে বাড়ি, তার বাবা কোম্পানির শ্রমিক৷ কত কি শিখেছি তার কাছে: চার-টোপের সুলুকসন্ধান: সর্ষের খোল, মেথি, দুধের সর, আরও কত কি ঘিয়ে ভেজে তৈরি সেই গোপন ফর্মুলার চার; ছিপ-ফাৎনা-বঁড়শি বাঁধা; খ্যাঁচ মারার টাইমিং; নারকেল তেল আর কস্টিক-সোডা মিশিয়ে গোলা-সাবান তৈরি; নানান জংলি গাছগাছালির গুণাগুণ … ঋণের শেষ নেই!

প্রথম হেডমাস্টার ছিলেন যিনি, তাঁর নাম মনে নেই তবু তাঁর বিরলকেশ, প্রবীণ চেহারাটা চোখের সামনে ভাসে৷ কমাস বাদেই এলেন জিতেনবাবু, সতীদির বাবা; কয়েক বছর পর কোনও কারণে তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়৷ তদ্দিনে অবশ্য আমি চুঁচড়োর স্কুলে৷ দু-বছর মাত্র ছিলাম, কিন্তু মায়ায় জড়িয়ে ছিলাম তার চেয়ে ঢের বেশি৷

[ক্রমশ]


The Fireflies (Three)

Hunting of the Snark

THEY SAY THAT Hāfez, the mystic poet, had left his homeland in search of his unrequited love, a strange lady whom he had seen for a fleeting moment from a distance. He was prepared to give away Samarkand and Bukhara for another glimpse of her face. I was less expansive, as I had neither Samarkand nor Bukhara to give away, for another look at the wonderful column of the July fireflies, but a slow fire burned within, unseen to others. The thirst for that chimeral sight stayed with me for many decades till the aftertaste became unsavoury but, at that time, it was very bright, haunting my idle moments, driving me insane with frustration. I did see many clusters of fireflies in the many years thereafter, large and small, but none ever as large or as grand. On the way to the company club from my mother’s house, near the sixteenth century Bandel Church, built three years after my father’s death, I often preferred the Sarat Sarani, a narrow, serpentine, pre-war loop of the Grand Trunk Road, abandoned to lesser use in favour of a wider and straighter version built by the wartime US army. The castaway loop was renamed after the famous novelist who was born and lived in a village not too far. That Bibutibhushan Bandyopadhyay lived in a house much nearer was conveniently forgotten by the naming authorities. In the awkward silence broken only by cicada song and frog chorus—ardent mating calls both—there loomed a dense clump of আশশেওড়া trees at one bend. The last tree in this clump cast a silhouette against the night sky that resembled the head of a serene, cud-chomping camel looking skywards as they often do in real life. It never failed to remind me of Jibanananda’s “…silence, awkward like a camel’s neck” (উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতা). The illusion was lost between dawn and dusk when the tree was just another. The darkness beneath the clump was often chosen by the less glamorous, local fireflies for gala dance parties. Shortly after my wedding, I pointed out the camel-faced tree to my wife, “That’s the camel tree I often spoke of”.  We got down from the car to get a closer glimpse. “Look at those fireflies”, she exclaimed unprompted, for I hadn’t told her about mine and, following her gaze, I saw an ordinary, faintly luminous cluster, large indeed, but lifeless, remaining glued to its spot without any pretence of sentience.

Thanks to the mixed background of my childhood — semi-urban mostly, broken with occasional wicked (Happy Boy and Magnolia ice-creams, pastries at the Trinkas with my parents, and an extra cup with the pot, courtesy the tea-shop management) urban weekends and tame rural summer vacations (আলিপথ ধরে হাঁটা)—had given me certain advantages in life. No one had to take the pains of breaking the secret of birds and bees to me; stray pets and captive cattle made it that easy. And I picked up quite a few agricultural tips from green-fingered কেষ্ট মালি, and practiced them under his indulgent supervision. In Santiniketan, হরিপদ-দা had explained the mystery of the heady fragrance, akin to that of rice pudding (পায়েস) on the boil, that wafted from the paddy field to the cowshed: “ধানের বুকে দুধ এয়েচে যে!” I had seen a majestic white owl, a লক্ষ্মী পেঁচা, catch a frog one rainy evening. I had heard distant wails, বলো হরি হরিবোল, of gleeful mourners drunk on country liquour, in the middle of some nights, when they brought the hapless corpses to the local ghat. Such mundane knowledge had prepared me for Jibanananda’s brand of poems, and Blake’s, and, later still, my own. But none of the poets, or কেষ্ট মালি, or হরিপদ-দা, had ever known what I had seen one July, passing from the lesser copses of the IOQ to the disciplined arrays of the iron soldiers.

THE TENDER AGE, the years before you start reasoning, is also the most vulnerable. Every grief of parting—losing a toy, or transfer elsewhere of the parents of a close friend, or losing near ones, or ones familiar environs—is keenly felt at that age that cannot be relieved by sharing with others. And adults often talk in such ambiguous terms! Sometimes they backtrack on their own points, contradict themselves and other adults, leaving no alternative to the child but to be a keen observer of the errant grown-ups and suffer their ambiguities and contradictions in silence. My paternal grandfather, already in his death bed but still lucid, had advised me to be watchful of every moment, notice all oddities, weigh the idiosyncrasies, and dissect common-or-garden events regardless of how minor they seemed; মনে রাখবা, নিজের চোখে দেখা আর নিজের কানে শুনার উপর কুনও সইত্য নাই. He got his diploma from the Medical College, where BC Roy (who, the then chief minister, had confirmed his self-diagnosis and monitored his terminal treatment), CL Ganguli (who attended him several times) and KM Sen Shastri (a Medical College drop-out but a qualified Ayurvedic physician, besides being a Sanskrit scholar; years later my mother-to-be was shown the light of day by his eldest daughter) were his classmates. দাদু was a silent polymath in his own right—a rare breed, I suppose, even in those days—able to tutor his daughter all through till her English honours degree, for she wasn’t allowed to attend school or college till she enrolled in the university. I had often seen him, reading glasses in place, leafing through The Pilgrim’s Progress or a bound volume of the Strand Magazine, both well-thumbed, in silent afternoons. Who was I to ignore his sage advice?

Long before that I had begun noticing the kaleidoscopic world around me on my own. And that was also my undoing, for many adults around me resented being watched. And observant I was. A clear patch between two copses in the lesser field, diagonally opposite our front door in the IOQ, was sown one year with a crop of corn. In a bigger plot next to it, my father had carefully nurtured some glorious sunflowers, larger than usual. It must have been later the same year as the fireflies that a large flock of emerald parrots descended on these two adjacent patches. I watched them day after day, simultaneously in childlike wonder and grown-up curiosity, noting how they took turns to allow all members to partake of the feast till there was nothing left. Pedalling along on my tricycle (bought second hand from a home-bound gora officer), I followed Khoka-da’s factotum once all the way to the market one afternoon. Meanwhile my mother was restive and a search party was being formed when they saw me return tagging Chitta-da along. Till then it was my biggest solo (if you could call it that) adventure — at the price of Chitta-da’s job, though I wasn’t told about it then. It took me a while to realise how unfair and cruel the adults were!

MY SCHOOL-LIFE BEGAN that January (1951). IOQ gardens were resplendent in season flowers and quite a variety of roses. There, barely two months after my fourth birthday, I met many of my class mates for the first time. The rickshaw ride to school retraced part of my tricycle-adventure route and then quite a bit, about a quarter of an hour each way, circumscribing the factory boundary. My father wouldn’t get me a gate pass for the shorter passage through the factory: “Let him not take undue advantages”, he told my mother once. There are dark patches in the tapestry of my memory, like random macular degeneration; I often err in the chronology of events at others. I think Heather Castellari and Carol Wallington were my first rickshaw mates, later replaced by Ranjan (নন্তু) Bose. When so many portals of the wonderful world were opening for me in the IOQ and its sylvan surrounds, despite the fact that for some months I was tied down to my mother’s bedroom (the room that carried the fragrance of her daily Ushashi talc, Hazel snow, Oaten (?) cold cream and Aguru scent, or, on formal occasions, Max Factor Compact and a treasured Channel V) by hepatitis, they were actually planning to shift to The Estate, on the other side of the factory, where the interspersed paddy fields and the wetlands (বাদা) were. A number of my IOQ friends had already left for this green pasture. One day I was made to leave my emerald parrots, the colourful beds of flowers and friendly copses behind from which had once emerged my fireflies. There were many blocks of flats on one side of the Link Road, the spanking new road that linked the factory to the Grand Trunk Road beyond, two stories to each block, two flats per floor of those superbly detailed red brick buildings, their exterior brickwork bare and pointed, doors, metal window-frames and railings painted green. Flat number 116, in one of five blocks that also had sun-verandas, was to be ours till 1965. It was larger, no doubt, and had a rear balcony that covered the entire width of each block overlooking a fair-sized garden plot.                                  

(To be continued to the next episode)

The Fireflies (Two)

Growth Pangs

CHILDREN ARE GIVEN far less credit than is their due for understanding and adjusting to the adult world they grow up in. They are built that way, to fend for themselves when necessary, demand attention when distressed or bored with life, and are resilient to boot when the storm blows hard. I began growing in a dichotomous world: one that was appreciative but often unreasonable; the other that never tried to touch my mind, let alone my heart.

Most of my early memories, as I have said before, were IOQ-centric.

There were these varicoloured patabahar trees across the road. Early one bright morning I had discovered there the first real bird’s nest that I had ever seen, complete with three tiny eggs, bluish with brown streaks. My follow-up quest took me through the various stages from the hatching, the dirty yellow nestlings being fed mouth to mouth by the parents, the process of their growing up at a pace far greater than my own (not that I knew it then), their training flights and unaided foraging endeavours. Then, one fine morning, the nest was abandoned. Memory of the empty nest is etched in my mind as a symbol of sadness. It was also a symbol of death, for I found the abandoned carcase of one of the nestlings in a nearby bush.

I had witnessed human deaths too.

A glass-covered hearse came one day, all the way from Calcutta, to carry Mr. Jones away. Mrs. Jones, red- and rheumy-eyed, followed it in a chauffeured company car, chaperoned by Mrs. Castellari and Mrs. Wallington, to a cemetery in Calcutta. Other cars followed. But, unlike the birds’ nest, their house didn’t remain vacant for long.

Then, barely a few months after the গৃহপ্রবেশ to his new house at Jadavpur, my grandfather (maternal) had a stroke. (The memory of the গৃহপ্রবেশ is still fresh in my mind. All of us were circumambulating the perimeter of the property. I enjoyed the ritual, like only a child could, favouring the hyacinth-covered pond-side stretch, for the concrete lid on the septic tank there didn’t sit properly and would see-saw noisily every time I stepped on its corner). My mother rushed by train to his house with me, all the way from the mofussil town 40 odd miles away from Calcutta, as soon as she got the word. Never gaining consciousness, he died early in the morning the next day. Standing on the window-sill that grey morning what I felt was a sense of emptiness. Grandfather used to go out of his way to pamper me with books. An olive-green school satchel (with a wood ruler, a box of Reeves crayons and a few Venus pencils and an eraser, a Rana Pratap drawing book and several books — Bengali and English) was his last ever gift to me. One of the books, “No-Good, the Dancing Donkey” by Dorothea Johnston Snow, remained my special favourite, and adorned my bedside till puberty, when my brother, over nine years my junior, took it apart.

I was struck with hepatitis within a few days of that, and was confined to bed for months.

Somehow, the memories of the fireflies, the avian death near the patabahar tree, Mr. Jones’s (whom I didn’t know well or miss at all) last journey in the glass hearse, বামন দাদু’s serene face in death, my debilitating illness that had restricted my diet to the blandest of boiled fare and confined me first to bed and then within home, and finally our leaving the IOQ forever in favour of the newly built residential complex, the Estate, were all tangled up in my memory as an inseparable unit, despite the fairly wide passage of time between the first and the final, as symbols of loss. Well into my working life, perhaps in the early seventies, another was added, unbeknownst, to that tangle: I saw it inscribed on a pillar of the riverside gazebo at the Triveni crematorium: নিদয় হরি, কি নিলে!

THERE WAS NO dearth of companionship for me those days. I had many friends within the IOQ, and at the Staff Quarters beyond the factory proper and also the sports ground, some more at Mrs. D’Cruz’s, and a veritable army of cousins of all sorts in Calcutta, where we dutifully went almost every weekend in a dusty inter-class of a local train from Bandel at 13:20. Some urban attractions were available at the IOQ too.

The cake-man, with his ware neatly arranged in a black-japanned steel trunk on his head, came every Wednesday, usually around four in the afternoon. All the children would get to know instantly and make a beeline, no matter where they were, despite the consternation of their red-faced mothers. The সরভাজা-সরপুরিয়া vendor would come as often as he could; so did the জয়নগর man with date palm treacle and jaggery and মোয়া in winter. The banjo-strumming, accordion-playing Anglo-Indian singers from Bow Barracks, usually two in a team, would come once a week in the darkness of evenings, and sing treacly Sinatra and Eartha Kitt songs, and merry numbers for children sometimes. I fondly remember one that went “She’ll be coming round the mountains,/ when she comes, when she comes,/ singing aye aye yippee yippee aye”. (I should confess that I am somewhat confused about this song. Somewhere in my memory-bank the jingle “She’ll be wearing silk pyjamas when she comes” got stuck; I thought it was part of the same song, though Google tells me that it was from a different, bawdry song of World War II vintage). Friday was the bookman’s day: paperback thrillers and crime stories, Mills and Boon for aunties, an occasional Bengali novel or two for কাকিমাs, and loads of magazines, pattern books and comics — Dell, Looney Tunes, Superman and Classics (Disney, somehow, was absent but one called the Super-Duck was very much there, though it wasn’t of Disney origin). I had cut my teeth on father’s science fiction pulp novels bought mostly from the bookman. For Bengali books we preferred the Ideal Book Stall near my grandfather’s flat at Gariahat; Jijnasa, diagonally on the opposite pavement going towards Triangular Park and not too far; and, for a short while, the nearest of the three, ToBCo (hope I’ve got the upper cases right), only a few houses off. The last named was a tobacconist where my father got his shag; it also sold books. I was given Lalitmohan Bandyopadhyaya’s পঞ্চরঙ্গ and Bimal Datta’s সিংখুড়োর গল্প bought from that shop in the early stage of my jaundice. I still have the latter, sans the cover, though the stitches are in a state of near disintegration.

The company auditorium was multifunctional before it was given over to cinemas only. In the mornings it housed the Bengali school till a new building came up (I joined the school in 1955 in its spanking new building close by); five days a week it was the club house between four and nine in the evening, boasting of several card tables and a table tennis board, two outdoor Badminton and a concreted tennis court somewhat away; on Fridays (English movies in the night show) and Saturdays it was converted into a cinema hall for all three shows, when the ubiquitous pea-nut and মশলা মুড়ি vendors gathered around. I can’t remember seeing any ফুচকাওয়ালা though; guess the vendors didn’t find the town market-worthy in those days.

When my other grandfather (paternal) died a year or two later, the family was prepared for it, for he had cancer of the pancreas, leading to uncontrollable diabetes and, eventually, multiple organ failure. It wasn’t possible for my father or his Delhiite elder brother to leave their jobs for an indefinite period. My mother’s service was called for. I was still convalescing from jaundice and so accompanied her, and was put under a lady tutor. I witnessed my দাদু’s growing agony first hand but was not scarred in the process to the great disappointment of a few nosey relatives of mine. And, from Mr. Bhowmik, the paramedic, I quickly learned the cumbrous titrative process of determining the sugar level in দাদু’s urine. The paramedic was not needed to come every day after I became a veritable adept. Later, my জ্যেঠি and পিসি too were commandeered to tide over the crisis that got too big for my mother and grandmother. ওগো দাদু, I called him that for grandma used to address him obliquely as ওগো (are-you-listening is the nearest translation), was not demonstrative in his affection.

Whenever in Calcutta, I used to accompany him to the lakes in his evening constitutionals, before he fell ill. Every few yards he would stop to speak to acquaintances (he had far too many), discuss their prognosis with his non-paying patients — usually bhistiwallahs (they supplied water to his flat in buffalo-skin bags for the supply line was unreliable; already a vanishing breed at that time, like those who walked miles to light the gas-fired street lamps on Ramani Chatterjee Street seen clearly from grandfather’s bedroom window) and homebound maidservants — and also making his presence known to several of his friends, young and old, who happened to be looking on from their balconies. He narrated the stories of the Iliad and the Odyssey to me in between, and tales of the Arabian nights, and explained some finer points of diagnosis or medicine. “Never be a doctor when you grow up”, he told me once, though he was one and belonged to the vaidya caste of medicos. “Not one of my relatives has ever earned much, for they were too soft to ask for what was their due; মহাশয় হইলে মহত বিষয়-আশয় হয়না“. I remember that my father, জ্যেঠা and my elder cousin from Delhi were there too when his end came. After his death (which must have been a great relief for him and his dear ones), grandmother refused to leave the house for our one-horse town with all its সাহেবি amenities available at least once a week.

That was when The Ten Commandments was running in the New Empire. Father, with his fresh-tonsured head (not that that made too much of a difference to his advancing baldness), took all of us cousins to see it, so as to relieve us from what he saw as “an unhealthy, oppressive air”. All the spectators in the hall would stare rudely at my his pate, for Yule Brynner, with a shinier one, played Rameses II in the Cecil B. DeMille blockbuster.

I vividly remember the smallest details of his illness and death but his death, for some reason, never got enmeshed in the tangled cluster of my firefly grief. May be I was a bit grown up, a little wiser by then.

The small town that was my home for many more years to come was great to grow up in for all its positive attributes, if you didn’t count the frog-in-the-well existence as too bad, but, for me, the miasma of sadness refused to clear up ever, though leaving the IOQ for the Estate was very much a part of that.

That wasn’t the end of my growth pangs.

                                      (To be continued to other episodes)

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 59 other followers