ঠিক দুক্কুরবেলা, যখন ভূতে মারে ঢেলা, চারদিক শুনশান, বাবুরা আপিসে, কাকিমা-মাসিমারা নিদ্রালু, দূর থেকে শোনা যেত ডাহুকের নালিশ, প্রেম-পাগল কুকুরদের ভৌভৌকার, শিলকাটা ইশানের ডাক, সাত-সতেরো পাখ-পাখালির হঠাৎ চেঁচামেচি৷ কর্তৃপক্ষের নিষেধ সত্ত্বেও গ্রাম থেকে ঘাসুরেরা কাস্তে দিয়ে লনের ঘাস কেটে নিত নির্জনতার সুযোগে৷ লাফঝাঁপ থেকে নির্বাসিত আমি সান-বারান্দায় দাঁড়াতাম এসে, হাতে হয়ত রাজকাহিনী কিংবা সিংখুড়োর গপ্পো, মনটা বাইরের বিস্তারে৷ দেখতাম, রাজ্যের কাক এসে জড়ো হচ্ছে পাশের ব্লকের ছাতে, মিটিং হবে এবার, লোকসভা-বিধানসভার মত ভয়ানক চেঁচামেচি৷ বিচার হচ্ছে কোনও গুরুতর আইনভঙ্গকারী বায়সপুঙ্গবের৷ ওদের বিচারব্যবস্থা গণতান্ত্রিক এবং দ্রুত; নিষ্পত্তি হয়ে গেলে তক্ষুনি শাস্তি হয় অপরাধীর — ঘাতক কাকেরা সাংঘাতিক ঠোকরায় তাকে, অন্যেরা রোমান সার্কাসের হৃদয়হীন দর্শকের মত ছিছিৎকার করে আর ডানা ঝাপটিয়ে ঘাতকদের উৎসাহ দেয়৷ না-হওয়া প্রাচীরের ওপাশে, সবুজ-হলুদ দাবাছক খেতে, পাখমারারা কি যেন বলে চেঁচায়৷…
“ছেলে ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো, বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?” জমিদারের খাজনা দেবার সময়ই কি শুধু বর্গি-বুলবুলির অজুহাত? না বোধহয়৷ এস্টেটের বাড়িতে ঢোকার সময় ইয়ং-সাহেবের ঢেউখেলানো পাঁচিল সম্পূর্ণ হয়নি; সীমানার ওপারে বিস্তীর্ণ ধান খেত, মুসুর খেত, সর্ষে খেত দেখা যেত, দেখা যেত সেই দিগন্তবিস্তারী সবুজ-হলুদ ঢেউয়ের মাঝখানটিতে আম-কাঁঠাল-বাঁশঝাড় ঘেরা ছোট্ট একটা পটে আঁকা গ্রাম, ছায়াঘন, অসিত হালদারের জলরঙের মত৷ ফসলের সময় রাজ্যের পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসতো কোথা থেকে, তবে খাজনালোভী বুলবুলিদের দেখেছি বলে মনে পড়েনা৷ পাখমারারাও উদয় হত আকাশ ফুঁড়ে৷
বাংলায় চুয়াড় নামে একটা আদিবাসী জাত আছে, নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে সাঁওতাল-মুন্ডাদের সমগোত্রীয়৷ তাদেরই নামে আমরা না ভেবে বলি চোয়াড়ে স্বভাব, চোয়াড়ে চেহারা, চোয়াড়ে ভাষা৷ এদের এক শাখা এই পাখমারা; নামেই পরিচয় — পাখি মারা তাদের পেশা৷ দীর্ঘকাল ধরে চাষি-গেরস্তদের ফসল রক্ষা করত তারা; রামের মিত্র গুহর মত কাঁধে ধনুক, তুনীরে তিরের বদলে কোমরে গোঁজা কেঠো মাথার ভোঁতা বাঁটুল, পিঠের ঝুলিতে জাল৷ আর থাকত ভীষণদর্শন মুখ আঁকা কেলে হাঁড়ি — নরম মাটিতে ডাল পুঁতে মাথায় চড়িয়ে দিলেই খাসা কাকতাড়ুয়া! এ ছাড়া ক্যানেস্তারা পেটানোর সরঞ্জাম৷ বাবা বলেছিলেন ওরা নাকি যাযাবর: খেতিকাজের সময় এখানে, বছরের বাকি সময় কোথায় থাকে, কি করে, কে জানে! পাঁচিল উঠে যাবার পরে আর দেখিনি তাদের, তবে বড় হয়ে কেতাবে পড়েছি৷
গোবিন্দ নামের পাখমারাটার বছর পনেরো বয়েস, দীঘল রোগাটে শরীর, খাকি হাপপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরা ধূসর চেহারা৷ ট্রাইসাইকেল চালাতে দেখে ঝোপ পেরিয়ে এপারে এসে ভাব করেছিল; তার মুখটা এখনও মনে পড়ে৷ বয়েসে আমার চেয়ে বড় হলেও আমাকে ভালো লেগেছিল তার, আমারও তাকে৷ কারণ ছিল৷ সেযুগে অস্ট্রেলিয়া থেকে ক্রাফট চিজ আসতো কাচের গেলাসে; প্রথম দিনই তাকে দিয়েছিলাম আমার বরাদ্দের টুকরোটা, তার পর থেকে মংঘারামের বিশকুট কিংবা কমলালেবু-আপেল৷ তাছাড়াও মা তাকে দুধ দিতেন, ঘরে তৈরি কেক দিতেন৷ জঙ্গলে পাওয়া যায়না সেসব, তাই সে আগে কখনও খায়নি৷ বলেছিল, জঙ্গলে আম-জাম-কাঁঠাল তো আছেই, খেত বাঁচানোর মজুরি স্বরূপ ছালা বোঝাই চাল-ডাল-নুন-তেল আছে, বন ভরা পাখি-খরগোশ-সজারু আছে, দিব্যি কেটে যায়৷ “ধ্যাৎ, সজারু খাস কি করে, অত কাঁটা!” সে আমার অজ্ঞতায় মজা পেত: “ছাল ছাড়ালেই সজারু তো খরগোশ, শ্যালের ভয়ে ওরা কাঁটা পরে থাকে, তাও জানিসনা!” … গোবিন্দদের ডাক পড়ত ধান বেড়ে উঠলে, তারপর কাজ ফুরুলে পাজি, যাও, চরে খাওগে! কাজ ফুরুলে যে পাজি হয় সে শিক্ষায় আমার সেই হাতেখড়ি; অনেক পরে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি ৷
আমার সেই স্নিগ্ধ, ছায়াময় আই.ও.কিউ.-এর কাছে এস্টেটের চেষ্টাকৃত শহুরেপনা ফিকে মনে হত বহুকাল৷ কালে কালে সেখানে বাস্তুর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেল, প্রায় আকন্ঠ ভরে গেল ইয়ং-সাহেবের পূর্বপরিকল্পিত সীমারেখা৷ দু-দুটো ক্লাব হল — তার একটায় সুইমিং পুল, স্কোয়াশ কোর্ট, চেনা স্পোর্টস গ্রাউন্ডের বদলে আনকোরা মাঠ, নতুন বাজার, লেডিজ পার্ক, তিন ভাষার তিনটে আলাদা স্কুল৷ তবে সেখানে আমার বহুকালের চেনা সেই জোনাকিদের দেখিনি কখনো, যদিও দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল সর্বদাই ৷ … সম্প্রতি অনেক দিন জনশূন্য ছিল সেই এস্টেট, ঋকবেদের হরিযুপিয়ার ধ্বংসাবশেষের মত ফোকলা দরজা-জানালা, লুঠ হয়ে যাওয়া আলো-পাখা-কল; তবে ছিল৷ দু-একবার জি.টি.রোড দিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার সময় দূর থেকে দেখতে পেতাম৷ ইদানীং শুনি নতুন মালিক, হিসেব মিলিয়ে চতুর্থ পক্ষের, সেই সব ইমারত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, হয়ত যাতে আগামি দিনের কোনও রাখালদাস, কোনও মার্শাল, একটা ইটও খুঁজে না পায়; যাতে আবার অক্ষতযোনি কুমারী হয়ে ওঠে গোটা অঞ্চলটা; তাকে যথেচ্ছ রমণ করতে উদ্ধত লিঙ্গের মত সারি সারি বহুতল গজিয়ে উঠবে হয়ত সর্বত্র, লোভে চকচক প্রোমোটারের চোখ, লকলকে কামাসক্ত জিভ তাদের!
সেই জোনাকিদের কম খুঁজেছি নাকি!
ভাইয়ের যখন দশমাস বয়েস, মায়ের শরীর সারাবার জন্য দার্জিলিং গেলাম সকলে৷ মলের এক প্রান্তে এলিস হোটেলে উঠেছিলাম৷ সুধীদা, সুধীরঞ্জন দাস, সুপ্রিম কোর্টের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি এবং পরে বিশ্বভারতীর উপাচার্য, সস্ত্রীক উঠেছেন ঠিক আমাদের পাশের কামরায়৷ অন্যত্র গৌরী দেবী আর গৌতম, মহানায়কের (তখনও শুধুই নায়ক) স্ত্রী ও আমার প্রায় সমবয়সী তাঁর পুত্র৷ তাঁরা এসেছেন, এবং উইন্ডামেয়ারে না উঠে ‘অনুত্তম’ এলিসে উঠেছেন, কারণ গৌতমের জলবসন্ত৷ স্কুল-কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়েছেন একুশ দিনের মত ছেলেকে ‘অন্য কোথাও’ নিয়ে যেতে৷ সেই ‘অন্য কোথাও’, অভিভাবকদের বিচারে, কলকাতার স্বগৃহ না হয়ে দার্জিলিঙের ‘হোটেল এলিস ভিলা’৷ সঙ্গে আছে নায়কের সেক্রেটারি, জনৈক শম্ভু৷ এসব কথা, জানাজানি হবার আগে, গৌতমই বলেছিল আমায়; তখনও তার চুমটি পড়েনি৷ অগত্যা, সুধীদার নির্দেশক্রমে এবং, আমার না-হোক, আমার দশমাসের কচি ভাইটার খাতিরে, আমরা সারাদিন যথাসম্ভব বাইরে বাইরে কাটাতাম৷ … তখনও দার্জিলিং এখনকার মত ঘেয়ো, বাক্সসর্বস্ব, ঘিঞ্জি শহর নয় — খোলামেলা মল, স্টেপ-আ-সাইড দিয়ে নেমে গেলে বেহেশতের ঠিকানা৷ সারাদিনের ভাড়া করা টাট্টু নিয়ে, অথবা পদাতিক, আজ এ-রাস্তা কাল ও-রাস্তা চষে বেড়াতাম৷ সন্ধে বেলা ক্যাপিটলে সিনেমা, ইংরেজি ছবি থাকলে৷ জীবনানন্দের হালভাঙা নাবিকের মত, বাচ্চা নাবিক, বিদিশা-শ্রাবস্তী-দারুচিনি দ্বীপ দাপিয়ে বেড়াতাম সারাদিন৷ বাবা-মা-ভাই তখন স্যানাটোরিয়ামে শান্তিনিকেতনের বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন৷ … আমার গতিপথে সরল গাছের বন ছিল অনেক, ছায়াঘন, তার ফাঁকে ফাঁকে অনেক সম্ভাবনাময় ঝোপজঙ্গল; খেলনা-মাপের বাঁশঝাড়; শেওলায় সবুজ পাহাড়ের গা, জ্যান্ত গাছের গুঁড়ি আর আলগা পাথর; পাহাড়ি ফুল ঝুমকোলতার মত নতমুখ ফুটে থাকত থোকায় থোকায় — সেসব বিচিত্রবর্ণ ফুলের ছবি জল রঙে আঁকলে বিশ্বাস করবে না কেউ! কথায় কথায় উড়ো মেঘ এসে ওড়নায় ঢেকে দিত তাদের অবয়ব৷ এমন জায়গায় খুব মানাত সেই জোনাকিদের, তবু কোত্থাও তাদের দেখিনি!
পুরীর সামুদ্রিক হাওয়ায় জোনাকিরা উড়ে যায়; ঘিঞ্জি গলির অন্ধকারে, হৃদয়হীন পাথরের মন্দিরে তাদের মানায় না৷ কলকাতার বড় রাস্তায় বড্ড বেশি আলো আর নিরালোক গলিঘুঁজিতে দুটো মানুষই পাশাপাশি যেতে পারেনা, কয়েক কোটি জোনাকি তো কোন ছার! দেওঘরে জুগনু ছিল অনেক, বমপাস-টাউনের সার সার অবহেলিত দালান-কোঠার জঙ্গুলে বাগানে, পেয়ারাতলায়, অস্পৃষ্ট আতা-নোনার ফলসম্ভারে, হাস্নাহানা আর যুইঁয়ের সুগন্ধী ঝোপের আড়ালে, কিন্তু বিহারী জোনাকি তারা, আমার চেনা কেউ নয়৷
যেখানেই যাই, মনে হয়েছে, “হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনওখানে!”
কোথায় খুঁজবো তাদের, কোন নিরুদ্দেশে? শান্তিনিকেতনে তারা ‘ইচ্ছে হয়ে ছিল মনের মাঝারে’, কিন্তু গুরুপল্লী বা শ্রীপল্লীতে নয়, ছেলেবেলাতেও নয়৷ তখন চাকরি করছি কয়েক বছর৷ সুবীর, আমার স্থপতি সুহৃদ, তখন আমার সহকর্মীও৷ লাটবাগানে তার বিভাগের ভাড়া করা ফ্ল্যাট ছিল আমাদের বাড়ি থেকে দুমিনিটের হাঁটা পথ, তবু আমাদের সঙ্গেই তার থাকা-নাওয়া-খাওয়া৷ আমার আত্মীয়েরা, পারিবারিক ও বিবিধ বন্ধুরা, তারও খুব পরিচিত হয়ে গেছে তত দিনে৷ এক সঙ্গে দিল্লি বেড়াতে গিয়ে আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি উঠেছিলাম একবার, এবং তাঁদের যথেচ্ছ জ্বালিয়েছিলাম দুজনেই, নির্দ্বিধায়, নিঃসংকোচে৷ অসাধারণ মেধাবী ছিল সুবীর; অধীত বিদ্যা ছাড়াও যান্ত্রিক-বৈদ্যুতিক-বৈদ্যুতিন কারিগরিতে; হাতেগড়া মডেল বিমানের বেতার উড়ানে; প্রাচীণ, ফেলে দেওয়া, ডগলাস মোটরসাইকেল দুশো টাকায় কিনে, তিন মাসের মধ্যে স্বহস্তে সারিয়ে তুলে, স্টেটসম্যানের ভিন্টাজ কার প্রদর্শনীতে যোগ দেওয়ার প্রকল্পে; দুনিয়ার কল্পবিজ্ঞানের গল্পে তার জুড়ি মেলা দায়৷…কারখানায় দোল-হোলি মিলিয়ে দুদিন ছুটি থাকত৷ সত্তরের দশকের শুরুর দিকে একবার তার মোটরসাইকেলে (ডগলাসের চেয়ে তরুণতর অন্য এক দেশি মডেল) হঠাৎ, উঠলো বাই তো, শান্তিনিকেতন চলে গেলাম দুজন, দোলের আগের দিন বিকেলে, উঠলাম দাদির শ্রীপল্লীর বাড়িতে, অনাহুত, কিন্তু পরম আদরে ডেকে নিয়েছিলেন দাদি, আমার মায়ের দিদিমা, তাঁর স্বভাব-সুলভ স্নেহে৷ তিনি যে ছিলেন সকল আশ্রমবাসীর ঠানদি!
পরদিন দেখি ‘খোল দ্বার খোল’-এর মিছিলে মালা এবং দর্শকের ভূমিকায় আমার কলকাতার বন্ধুবান্ধব বেশ কয়েকজন৷ মালা আছে মানে, দেখা না গেলেও, অতীনও আছে কোথাও৷ তখনও দোলের শান্তিনিকেতনে যারা যেত তারা সম্পর্কের টানেই যেত, যেত ভালোলাগা আর পরিচয়ের নেশায়, গড়িয়াহাট বা শ্যামবাজার পাঁচমাথার হুল্লোড় সঙ্গে বয়ে নিয়ে যেতনা৷ ভালোই হলো, কারণ আমার সমবয়েসী চেনা স্থানীয়দের দেখা পাইনি সেবার, তাই অমিতাদি সেদিন রাত্রে খেতে বলাতে আগেই বিনা ওজরে রাজি হয়েছিলাম৷ … অবেলায় কালো করে এসেছিল আকাশ; হবি তো হ, পরিক্রমা শেষ হতে-না-হতে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি নামল৷ বৃষ্টি ধরতেই অতীন বলল, “চ, কোপাই দেখবি চ”; দল বেঁধে গিয়ে দেখি রক্তের নদী বইছে — সে দৃশ্য আগে কখনো ঠাহর করে দেখিনি, সে ভাবে দেখার মনটাই তৈরি হয়নি হয়ত৷ সাধে কি আনন্দ বাগচী তাঁর কবিতায় “আলতার শিশি ভাঙলো, কোপাই কি শান্তিনিকেতনে” লিখেছিলেন! … অমিতাদির বাড়ি ডিনার মানে কাঁটায় কাঁটায় আটটা, তাই ঠিক হলো ছটার সময় মিলব সবাই চৈতির সামনে৷
সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে অমিতাদির বাড়ির উলটোদিকের খোয়াই, শ্রীপল্লীর রাস্তার ওপাশে৷ এখন সেখানে বিস্তর দোকান, আপিসঘর, নির্জনতা কেড়ে নিয়েছে; তখন সঙ্গীত-কলার ছাত্রাবাসটা ছিল বোধহয় — ছাত্রাবাস হিসেবে নয়, অতিথিশালা হিসেবে৷ কাঁকুরে মাটিতে গোল হয়ে বসলাম সবাই, তৃষিত মাটি তখন বৃষ্টির সব জল নিঃশেষে শুষে নিয়েছে৷ অর্জুন গলা ছেড়ে “আশায় আশায় ভালবাসায়, তোমার নাকি বিয়ে হবে” গাইল, আমরা হাত তালি দিয়ে হাসলাম সবাই; তারপর এ-কথা সে-কথা, এ-গান সে-গানের পর নয়না বলে একটি মেয়ে, আগে কখনও দেখিনি তাকে, পরেও নয়, “পূর্ণ চাঁদের মায়ায়” গাইল অসামান্য তৈরি গলায়৷ সে দেখতে কেমন, কি তার পরিচয়, এসব ভাবিনি৷ কন্ঠ দিয়ে সে একটা মায়ার জাল, পূর্ণ চাঁদের মায়ার জাল, বুনেছিল — যে চাঁদটা তখন স্নাত আকাশে একটা সরল প্রতীকের মত জ্বলজ্বল করছে; যে চাঁদটা পূর্ণ হলেও আশৈশব আমি বলতাম ‘পুরনো’ চাঁদ, চির চেনা, তবু নতুন চাঁদ ফি-পূর্নিমায় নতুন করে ওঠে, বসন্ত পূর্নিমায় আরো নতুন যেন! কোপাই তখন অনেক দূরে, দৃষ্টির আড়ালে, কিন্তু কল্পনায় তার রাঙা জলের ছলাৎছল শুনতে পাচ্ছিলাম৷ সেই মায়া, চাঁদের আলো আর সুরের মূর্চ্ছনা-মাখা সন্ধ্যায় আসা উচিত ছিল তাদের, তবু সেই জোনাকিরা আসেনি৷
আগে এক সময়ে এভরো-৭৪৮ বিমানের অনেক উড়ান ছিল দক্ষিণ ও পশ্চিম উপকূলে, লাফানে উড়ান, দুই বা তিন লাফে গন্তব্যে পৌঁছোত৷ তেমনই একটা উড়ানে মাদ্রাজ থেকে ব্যাঙ্গালোর কিংবা কোচিন যাচ্ছি একবার — সম্ভবত তিরুপতি ছুঁয়ে৷ তড়িঘড়ি উঠেছি বলে নম্বরহীন উড়ানে ডানদিকের শেষ লাইনে জানালার সীট পেয়ে গেছি, অন্যটা খালি — ব্রীফকেসটা রেখেছি সেখানে৷ সে বয়েসে অবশ্যই আশা করতাম কোনও সুন্দরী সেই খালি আসনটা দখল করবেন হয়ত, কিন্তু মধ্যপথে উঠলেন এক দক্ষিণী ভদ্রলোক, মাঝবয়সী; আমাকেও বিরক্তিভরে বাক্স কোলে নিতে হলো৷ বিমান ছাড়তে না ছাড়তে ভাব জমাতে শুরু করলেন৷ তিনি নাকি দেবরাজ আর্সের (তখন কর্ণাটকের মুখ্য মন্ত্রী) পোষা গণৎকার, এবং, তাঁর গণনায়, আর্স অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী হবেন অদূর ভবিষ্যতে! আমার কার্ড চাইলেন৷ তারপর শুরু হলো আমার নামের অক্ষরগুলো দিয়ে নিউমেরোলজির ব্যাখ্যান৷সাতকেলে অবিশ্বাসী, সেই আমাকেই শোনাচ্ছে ভূত-ভবিষ্যতের সাতকাহন! অতীতের দশটা কথা বললে, কে না জানে, চার-পাঁচটা মিলবেই৷ “তোমার জীবনে একটা বড় আঘাত এসেছিল” (পিতৃবিয়োগ, এটা কাকতালীয় কিন্তু সত্যি)৷ “অল্প বয়েসে খুব বড় চাকরি কর তুমি” (আমার কার্ডেই তার হদিস)৷ কিছুর মধ্যে কিছু নেই, হঠাৎ বললেন, “আরো বড় আঘাতের জন্য তৈরি থেকো, পঞ্চাশের কাছাকাছি, প্লাস-মাইনাস তিন!” এটা মোক্ষম এবং মজাদার ভবিষ্যৎবাণী, তায় আবার হবু প্রধানমন্ত্রীর খোদ গণকের মুখনিঃসৃত, স্বকর্ণে শুনেছি বলেই মনে ছিল৷ হাড়ে হাড়ে তার যাথার্থ্য টের পেয়েছি অনেক পরে ৷
জটিল রাবারের অণু বিস্তর ঘেঁটেছি; দরকার মত নির্দ্বিধায় ম্যানিপুলেট করা যেত তাদের, রামের সঙ্গে রহিমের ভাগ্য মিলিয়ে দিয়ে অচিন্ত্য নতুন গুণাবলী আরোপ করেছি অনায়াসে৷ মানুষ জাতটা রাবারের অণুর চেয়ে, আগেই জানতাম, অনেক অনেক বেশি জটিল, তবে অঙ্কের না হোক সমাজতত্বের নিয়ম তো মানে! কিন্তু কর্মীদের যারা অঙ্গুলিহেলনে চালায়, সেই মালিকপক্ষ ও তার সাক্ষাৎ প্রতিনিধিরা, এই অধমও যার বাইরে নই, তারা সেই পাঁচ হাজার মানুষের চেয়েও বেশি জটিল, ডি.এন.এ.’র জোড়া ইশক্রুপের প্যাঁচের ওপর কয়েক গুণ! চড়াইয়ের রাস্তায় শত্রুর সংখ্যা বাড়ে, তাও জানতাম৷ যাদের উপকার করেছি তারাই যে বেশি শত্রু হয় তাও, বিদ্যেসাগর-মশায়ের দৌলতে, অজানা নয়৷ তবে চেনা মানুষ, কাছের মানুষও যে কোথায় নামতে পারে তা বুঝিনি মোটেই৷ নিউমেরোলজিস্টের কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম কিন্তু ১৯৯৩এর শেষের দিকে, যখন আমার বয়েস সাতচল্লিশ, বিরোধীদের চাপে এবং বৃহত্তর দায়িত্বের নামে, নবকলেবর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ — রণাঙ্গনে যাঁদের দেখা দায় কিন্তু হোমারের গ্রীক দেবতাদের মত মরণশীল মানুষের বাঁচামরা যাঁদের হাতে — রাতারাতি কলকাতায় বদলি করলেন আমায়, নেই-সাম্রাজ্যের এক্কা গাড়ির ঠুলিআঁটা ঘোড়াটার ভূমিকায়৷ হেড আপিসে ঠাইঁ হলো একতলার টয়লেটের পাশের ঘরটায়, যেটা আগে ছিল কোম্পানি সেক্রেটারির কাগজপত্রের গুদাম৷ সেখান থেকে অবশ্য বাহুবলে সর্বোচ্চ তলার একটা ঘর দখল করেছিলাম আবার৷ সেসব ব্যাখ্যান নয়, আঘাতের ব্যাপারটা বোঝানো দরকার এখানে৷সেই জোনাকিদের থেকে বহু দুরের একটা হাঁপিয়ে ওঠা, রং চটা, যক্ষাগ্রস্ত শহরে নির্বাসন আমার মত লোকের কাছে দ্বীপান্তরের চেয়েও বৃহত্তর আঘাত৷ ১৯৯৪এর শেষের দিকে মুক্তির দরখাস্ত দিলাম, ১৯৯৫এর ফেব্রুয়ারিতে একতৃতীয়াংশ বেতনে যোগ দিলাম অন্যত্র৷ তারপর আর কারখানার চৌহদ্দির ছায়া মাড়াইনি কখনো৷
যতই নির্লিপ্ত হই, খেদ থেকে যায়৷ পঞ্চিপিসির খোঁজ করিনি আর৷ চোংকারদের এক মেয়ে, ইলা (তার দিদি, শীলা, ভারতসুন্দরী হয়েছিল একদা), আমাদের সঙ্গে পড়ত আন্টি ডি’ক্রুজের এলেবেলে স্কুলে, বড় হয়ে বিমান বালিকা হয়েছিল — একটা উড়ানে তার ফোন নম্বর দিয়েছিল পুরনো দিনের খাতিরে, দেখা করিনি৷ সুভাষ কুলকার্নির সঙ্গেও আলাপটা ঝালাইনি৷ সে সবই আমার দোষ, মানি৷ চুয়াড় জাতির প্রতিভূ গোবিন্দ সেই এক ফসলের পর আর আসেনি৷ ঘরে তৈরি ‘রাজাভোগ, পান্তুগোল্লা’ খাবার নিমন্ত্রণ করে ফটিকবাবু চিরকালের জন্য চলে গেলেন৷ ‘আলতার শিশি ভাঙা’ খোয়াইয়ের পূর্ণিমায় নয়না আর কোনও দিন গান শোনালোনা৷ সুবীরের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ হয়েছিল ইদানীং — সেটা দেখা-সাক্ষাতে পরিণত হওয়ার আগেই সে তড়িঘড়ি চলে গেল নিরুদ্দেশে, তর সইলনা৷ সেই জোনাকিরা যে ফিরে এলোনা আর৷ সেসবও কি আমার দোষ?